
স্পোর্টস ডেস্ক : কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধন হলো এক শারীরিক প্রতিবন্ধীর হাত ধরে। আপনার জন্ম যদি হয় রাজা কিংবা ধনকুবেরের ঘরে আর সেই সম্পদে যদি হন কোটিপতি, কী লাভ তাতে? আবার শরীরের উচ্চতা যদি হয় সাড়ে ছয় ফুট, লাফিয়ে চলেন ২৫ ফুট তাতেই বা অহংকার কিসের। বরং অভাবীর ঘরে জন্ম নিয়ে নিজেকে লাখপতি করুন আর তিন ফুট উচ্চতা নিয়ে ১৫ ফুট লাফিয়ে নিজেকে প্রমাণ করুন।
আপনি আসলে পারেন। যেমন এ সময়ের সবচেয়ে সার্থক বিজ্ঞানী স্টীফেন হকিং আর গনিম আল মুফতাহ। হকিং অবশ্য বেঁচে নেই। অঙ্গহানি নিয়ে জন্মেও নিজেকে প্রমাণ করা যায়। সেটাও এবার দেখিয়ে দিল কাতারের গনিম-আল-মুফতাহ্। নিচের ছবির এই যুবকের বয়স মাত্র ২০ বছর। তারচেয়েও বড় কথা তিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। কোমরের নিচ থেকে শরীরের অর্ধেক অংশই নাই।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, এই মুহূর্তে কাতারের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং বিখ্যাত একজন ব্যক্তি তিনি।। কারণ তাঁর হাত ধরেই বেজে উঠলো ফিফা বিশ্বকাপের ২০২২ বাঁশি।
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল আসরের উদ্বোধন করলেন গনিম-আল-মুফতাহ্। আল বাইয়াত ষ্টেডিয়ামের এই অনুষ্ঠান উপভোগ করলো গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমী।
গনিম-আল-মুফতাহ্-এর শরীরের নিচের অংশ নেই, জন্মের আগেই দুটো পা হারিয়ে ফেলেন।ঠিক সেটাও নয় আসলে মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে আসেন অর্ধেক শরীর নিয়ে।
“কোডাল রিগ্রেশন সিনড্রোম” রোগে আক্রান্ত গনিমের শরীরের নিম্নাংশ না থাকা সত্বেও তিনি গোটা কাতার তথা আরব দুনিয়ার একজন রোল মডেল। আরবের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভক্ত ও সমর্থকবৃন্দ। তিনি একজন বিশ্ববিখ্যাত মোটিভেশনাল স্পিকার। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে উজ্জীবিত, বর্ণময় হয়ে ওঠে হাজার বর্ণহীন জীবন। গনিম যখন মাতৃগর্ভে তখনই আলট্রা-সাউন্ড মেশিনে ধরা পড়ে তাঁর শরীরের অবিকশিত অংশ। ডাক্তার গর্ভপাতের পরামর্শ দেন।। কিন্তু গনিমের মা-বাবা এই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। কারণ ইসলামের বিধান অনুযায়ী গর্ভপাত হলো চূড়ান্ত অপরাধ।
গর্ভধারিণী মা “ইমান-উল-আবদেলি” এবং পিতা “মুহাম্মদ-আল-মুফতাহ্” এটাকে মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়ে বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্ম দিলেন।
মাতা-পিতার উদ্দেশে বলেন, ‘আমি হবো সন্তানের বাম পা, আর তুমি হবে তার ডান পা। আমরা দুজনে সন্তানকে কখনো নিম্নাংশের অভাব টের পেতে দেবো না।”
৫ মে ২০০২ সালে পৃথিবীর আলো দেখেন গনিম। কোডাল রিগ্রেশন সিনড্রোমকে সাথে জন্মেন তিনি। শিশুকাল থেকেই পদে পদে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়ে পড়েন তিনি। স্কুল, খেলার মাঠ সহ বিভিন্ন জায়গায় তাকে অপমানিত করা হতো। তিনি এসবের তোয়াক্কা না করেই এগিয়ে যেতেন নিজ পথে; একেবারে নিজস্ব ছন্দে। বন্ধুদের বোঝাতেন – তাঁর অসম্পূর্ণ শরীরের জন্য তিনি মোটেও দায়ী নন। আল্লাহ তাঁকে যে পরিমাণ অঙ্গ-প্রতঙ্গ প্রদান করে পাঠিয়েছেন এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
বর্তমানে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে তিনি আরব বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এই অর্ধেক শরীরী মানুষটাই আজ বিশ্ব দরবারে নিজের পরিচিতি তুলে ধরলেন।
তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সাফল্যের পথে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে না। প্রবল ইচ্ছা শক্তি আর পারপার্শ্বিক সহযোগিতাই মানুষকে অদম্য করে তোলে। আপনার আশপাশে এমন শারীরিক কিংবা মানসিক প্রতিবন্ধী কেউ থাকলে তাকে সহায়তা করুন। সাহস দিন। তার মধ্যে যে বিশেষত্ত আল্লাহ দিয়েছেন তার প্রস্ফুটনে সহায়তা করুন।
লেখক: মানিক মুনতাসীর, সাংবাদিক
কিউটিভি/অনিমা/২১ নভেম্বর ২০২২,খ্রিস্টাব্দ/দুপুর ১২:০১






