
২ মে ২০১২ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫.৩০ গণভবন, ঢাকা।
একটা পুরাতন শাড়ি পরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইলিয়াস আলীর পুত্র,কন্যা,ভ্রাতা ও স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা প্রবেশ করলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। আগতদের দেখতেই নিজ আসন থেকে উঠে গিয়ে শেখ হাসিনা জড়িয়ে ধরেছিলেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও কন্যাকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদল বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেছেন মি. আলীকে খুঁজে বের করতে সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে।
শেখ হাসিনা ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে আরও বলেছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে অপহরণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধের জের হিসেবে এটা করা হয়েছে বলে ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে অবহিত করেছিলেন শেখ হাসিনা।
মানবিক এই দৃশ্যটিতে শেখ হাসিনার শ্রেষ্ঠ অভিনয়নৈপুণ্য সেদিন বাংলাদেশের সকল টিভিতে ফলাও করে প্রচার করা হয়।
মূল ঘটনা ছিল, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যার পর দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ইলিয়াস আলী সভা করেন তৎকালীন শেরাটন হোটেলে (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল)। সভা শেষ করে রাত ১১টায় তিনি বের হন এবং গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলেন। অপহরণের লক্ষ্যে শেখ হাসিনার বিশেষ কিলার জিয়াউলের নির্দেশে শেরাটন থেকেই অনুসরণ করছিলেন র্যাবের সদস্য সার্জেন্ট তাহেরুল ইসলাম।
জবানবন্দিতে তাহেরুল উল্লেখ করেছেন, আমার দায়িত্ব ছিল শেরাটন থেকে অনুসরণ এবং বেতার বার্তায় গতিপথ জিয়াউল স্যারকে জানানো। নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনি ইলিয়াস আলীর গাড়ি অনুসরণ এবং প্রতিটি মুহূর্তে গাড়ির গতিপথ জিয়াকে অবহিত করা। মহাখালী পৌঁছার পর ইলিয়াস আলীর গাড়ি সরাসরি অনুসরণ শুরু করেন জিয়ার টিম। মহাখালী জলখাবার হোটেলের অদূরে বনানীর ২ নম্বর সড়কে গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে থামানোর পর ড্রাইভার আনসারসহ ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করে এই টিমের সদস্যরা। এরপরই জিয়া তাহেরুলকে বলেন, ‘তোমার ডিউটি শেষ, চলে যাও।’ নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব শেষে তিনি ফিরে যান তাহেরুল।
মনে করা হয় ১৭ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২০ এপ্রিলের মাঝে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
গুম তদন্ত কমিশন সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে এসএসএফ-এর মহাপরিচালক ছিলেন লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সওরাওয়ার্দী। তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ডিজিএফআইর তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়ে ইলিয়াস আলীকে গুম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
কেন ইলিয়াস আলীকে গুম করা হলো গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক ডিজিএফআই প্রধান মামুন খালেদ বলেন, টিপাইমুখ বাঁধ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের ঘোষণা দেন ইলিয়াস আলী। এসব কারণেই তাকে গুম করা হয়।
একদিকে স্বজন হারানোদের আহাজারি, অপরদিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এক বক্তব্যে উপহাস করে বলেছিলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার শাড়ির আঁচলে ইলিয়াস আলী লুকিয়ে আছেন।’ এই ছিল হাসিনা সরকারের নির্মম সকল কর্মকান্ড।
শেখ হাসিন কী ধরনের অভিনেত্রী ছিলেন! তাঁর নির্দেশ ছাড়া যেমন ইলিয়াস আলী গুম হননি, তাঁর নির্দেশ ছাড়া তাঁকে হত্যাও করা হয়নি। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী শিশুসন্তানকে নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ইলিয়াসকে খুব তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা ছিল এরকম- শেখ হাসিনা খুব ভালো করে জানেন, ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়েছে।
একটি মানুষের বিবেক কতটা পঁচে গলে নষ্ট হয়ে গেলে এমন আচরণ করতে পারে ? কত মানুষকেই না শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করেছে। কিন্তু গুম করে হত্যা নামক সংস্কৃতির কারণে হতভাগাদের পরিবার জানেনা এদের লাশ কোথায় অথবা কবে কখন হত্যা করা হয়েছে।
কবর জেয়ারত ও মৃত্যক্ষণ না জানার কারণে ইলিয়াস আলীর পরিবারের ন্যায় এমন হাজারো পরিবারের কাছে বছরের ৩৬৫ দিনই যেন এক মৃত্যদিবস। নদী নালা খালবিল, সমুদ্র বেষ্টিত পুরো বাংলাদেশটাই যেন মৃতদের এক বধ্যভূমি -পুরো দেশটাই যেন এক অজ্ঞাত কবর।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিপুল/০২.০৪.২০২৬/রাত ১১.২৫






