
”হরমুজ প্রণালী” মাত্র দুটি শব্দ কিভাবে পৃথিবীকে কঠিনভাবে ঝাকুনি দিতে পারে তা ভাবলেই বিস্মিত হতে হয়। সাম্প্রতিককালে সারা বিশ্বে যে শব্দ দুটি সবচেয়ে বেশি কথিত হয়েছে, লিখিত হয়েছে আর আলোচিত হয়েছে তা হলো ”হরমুজ প্রণালী”।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪০ দিনের সংঘর্ষের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। সেটি হলো, ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার পারমাণবিক সক্ষমতা নয়, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা।
হরমুজ প্রণালীকে ফার্সিতে তাঙ্গেইয়ে হোর্মোয্, আরবিতে মাদিক্বে হুরমুজ নামে অভিহিত করা হয়। ”হরমুজ প্রণালী” একটি সরু জলপথ যা পশ্চিমের পারস্য উপসাগরকে পূর্বে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করেছে।৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালীটি পারস্য উপসাগরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ওমান ও ইরানকে সংযুক্ত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরানকে পৃথক করেছে।
হরমুজ প্রণালী নামটি পারস্যের রাজা দ্বিতীয় শাপুর-এর মা ইফরা হুরমিজদ-এর নাম থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। তিনি ৩০৯ থেকে ৩৭৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন।
১০ম থেকে ১৭শ শতাব্দীর মধ্যে এখানে হরমুজ রাজ্য ছিল, ধারণা করা হয় এই প্রণালীর নাম এসেছে হরমুজ রাজ্যের কারণে। ইতিহাসবিদ ও ভাষাবিদদের মতে, “হরমুজ” নামটি এসেছে স্থানীয় ফারসি শব্দ হুর-মঘ থেকে, যার অর্থ খেজুর গাছ। হুরমোজ ও মিনাব এলাকার স্থানীয় উপভাষায় এই প্রণালীকে এখনও “হুরমঘ” বলা হয়, যার অর্থও ওই রকমই। এই শব্দের সাথে জরাথ্রুষ্ট্রীয় দেবতা হরমুজ নামটির মিল থাকার কারণে অনেকেই মনে করেন এই দুটি শব্দের মধ্যে সম্পর্ক আছে বিধায় এর নাম হরমুজ ।
এপ্রিল ১৯৫৯ সালে ইরান তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগ প্রসারিত করে ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিলোমিটার) এবং ঘোষণা করে যে এই নতুনভাবে প্রসারিত অঞ্চল দিয়ে শুধুমাত্র নিরীহ চলাচল-ই স্বীকৃত হবে বলে প্রণালীর আইনি মর্যাদা পরিবর্তন করে। জুলাই ১৯৭২ সালে, ওমানও ডিক্রির মাধ্যমে তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগ ১২ নটিক্যাল মাইল বা ২২ কিলোমিটার এ প্রসারিত করে। ফলে, ১৯৭২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণরূপে ইরান ও ওমানের সম্মিলিত সীমানাসংলগ্ন জলভাগ দ্বারা “বন্ধ” হয়ে যায়।
১৯৭০-এর দশকে, ইরান বা ওমান কোনোটিই প্রণালী দিয়ে যুদ্ধজাহাজের উত্তরণে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি, কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে উভয় দেশই প্রথাগত আইন থেকে ভিন্ন দাবি উত্থাপন করে। আগস্ট ১৯৮৯ সালে ইউএনসিএলওএস অনুমোদন করার সময়, ওমান তার ১৯৮১ সালের রাজকীয় ডিক্রি নিশ্চিত করে এমন ঘোষণা করে যে শুধুমাত্র নির্দোষ অতিক্রমণই তার সীমানাসংলগ্ন জলভাগের মধ্য দিয়ে অনুমোদিত।
ঘোষণাগুলিতে আরও দাবি করা হয়েছিল যে বিদেশী যুদ্ধজাহাজগুলির ওমানের সীমানাসংলগ্ন জলভাগ দিয়ে যাওয়ার আগে পূর্বানুমতি প্রয়োজন।ডিসেম্বর ১৯৮২ সালে কনভেনশনে স্বাক্ষর করার সময়, ইরান একটি ঘোষণায় বলে যে “শুধুমাত্র সমুদ্র আইন কনভেনশনের রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলিই এতে সৃষ্ট চুক্তিবদ্ধ অধিকারগুলির সুবিধা পাওয়ার অধিকারী”, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে “আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালীগুলির মধ্য দিয়ে ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার”।
মে ১৯৯৩ সালে, ইরান সামুদ্রিক অঞ্চলগুলির উপর একটি ব্যাপক আইন প্রণয়ন করে, যার বেশ কয়েকটি ধারা ইউএনসিএলওএসের বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। যার মধ্যে একটি হলো যে কোন যুদ্ধজাহাজ, ডুবোজাহাজ এবং পরমাণুশক্তিচালিত জাহাজগুলিকে ইরানের সীমানাসংলগ্ন জলভাগ দিয়ে নির্দোষ উত্তরণের অধিকার প্রয়োগ করার আগে অনুমতি নিতে হবে। ওমান ও ইরানের কোনও দাবিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে না এবং তাদের প্রত্যেকটির বিরোধিতা করেছে।
ওমানের কাছে হরমুজ প্রণালীতে টিএসএস নিরীক্ষণের জন্য একটি রাডার সাইট লিঙ্ক কোয়ালিটি ইন্ডিকেটর (এলকিউআই) রয়েছে। এই সাইটটি মুসান্দাম গভর্নোরেট-এর চূড়ায় অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপে।
”হরমুজ প্রণালী” সামুদ্রিক পথটি আন্তর্জাতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খনিজতেলবাহী জাহাজ যাতায়াতের এটিই একমাত্র পথ। বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম পরিবহনে প্রণালীটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যধিক। জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ২১ মাইল এবং প্রস্থ দুই মাইল। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মতে ২০০৯ সালে সমুদ্রপথে বৈশ্বিক খনিজ তেল বাণিজ্যের ৩৩ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সম্পাদিত হয়।
২০১৯ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে এক দিনে এক কোটি ৯০ লক্ষ ব্যারেল খনিজ তেল পরিবাহিত হয়। এ অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত পাহারা দিত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেলের বেশির ভাগই এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যায়। জাপানের আমদানিকৃত তেলের তিন-চতুর্থাংশ হরমুজের ওপর দিয়ে নিয়ে যায়। আর চীনের আমদানিকৃত তেলের অর্ধেকই আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের মতো তেলজাত দ্রব্য রপ্তানি হয়ে থাকে। এর সঙ্গে আছে তরলীকৃত গ্যাসও।
একটানা ৪০দিন ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। এই যুদ্ধের জয় পরাজয় বা যুদ্ধ বিরতিকরণের মুখ্য কারণে পরিণত হয় হরমুজ প্রণালী। সারা বিশ্বে জ্বালানী সংকট সৃষ্টি হয় ইরান কর্তৃক এই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্বাচীনতা মনে করা হয় এই কারণে যে যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তারা হরমুজ প্রণালীর ইস্যুটি আমলে নেয়নি। হয়তোবা এ কারণে বিশ্বের শ্রেষ্ট পরাশক্তি আজীবন এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে উচ্চারণ করবে দুটি শব্দ – তা হলো হরমুজ প্রণালী।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিপুল/১০.০৪.২০২৬/রাত ৯.৩০






