তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, ফোন চার্জে দেওয়ার সময় এয়ারপ্লেন মোড চালু করলে নাকি ব্যাটারি দ্রুত চার্জ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রযুক্তি ব্লগ কিংবা বন্ধুদের পরামর্শ—সবখানেই এই টিপসটি বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এটি কি সত্যিই কার্যকর, নাকি নিছক একটি ভুল ধারণা?
প্রযুক্তি–বিষয়ক ওয়েবসাইট এনগ্যাজেট–এর এক প্রতিবেদনে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এয়ারপ্লেন মোড কিছুটা সুবিধা দিলেও সেটি এতটাই সামান্য যে অধিকাংশ ব্যবহারকারীর জন্য তা বাস্তবে খুব একটা পার্থক্য তৈরি করে না।
এয়ারপ্লেন মোডে চার্জ দিলে কি সত্যিই দ্রুত চার্জ হয়?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—হ্যাঁ, হয়। তবে খুব সামান্য।
বর্তমান সময়ের স্মার্টফোনগুলোতে তারযুক্ত ও ওয়্যারলেস—উভয় ধরনের দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি রয়েছে। তবুও বিশেষ জরুরি মুহূর্তে আরও দ্রুত চার্জ পাওয়ার আশায় অনেকেই ফোন চার্জে দিয়ে এয়ারপ্লেন মোড চালু করেন।
বাস্তবে এয়ারপ্লেন মোড চালু থাকলে ফোনটি নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ ও অন্যান্য বেতার সংযোগের জন্য অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে না। ফলে চার্জের একটি অংশ সরাসরি ব্যাটারিতে জমা হতে পারে। তবে চার্জিং গতির এই বাড়তি সুবিধা এতটাই সীমিত যে সাধারণ ব্যবহারকারীর চোখে পড়ার মতো নয়।
অর্থাৎ, অল্প কিছুটা দ্রুত চার্জ পাওয়ার জন্য পুরো সময় ফোনটিকে কার্যত ব্যবহারের অযোগ্য করে রাখা কতটা যৌক্তিক—সেটিই মূল প্রশ্ন।
এয়ারপ্লেন মোড আসলে কী করে?
নাম থেকেই বোঝা যায়, এয়ারপ্লেন মোড মূলত উড়োজাহাজে নিরাপদে ফোন ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি ফিচার। এটি চালু করলে ফোনের সব ধরনের বেতার যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যেমন—
- সেলুলার নেটওয়ার্ক
- ওয়াই-ফাই
- ব্লুটুথ
- মোবাইল ডেটা
এর ফলে ইন্টারনেটভিত্তিক নোটিফিকেশন, অনলাইন বার্তা কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ড কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
শুধু বিমান ভ্রমণেই নয়, অনেকেই ফোন সম্পূর্ণ বন্ধ না করে সাময়িকভাবে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে বা কিছু সময় নিরিবিলি থাকতে এয়ারপ্লেন মোড ব্যবহার করেন। তবে এমন ক্ষেত্রে ডু নট ডিস্টার্ব বা ফোকাস মোড ব্যবহার করাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
ব্যাটারি সাশ্রয়ে এয়ারপ্লেন মোড কতটা কার্যকর?
এয়ারপ্লেন মোডের একটি বাস্তব সুবিধা হলো— এটি ব্যাটারির খরচ কমায়। যদি চার্জার ছাড়া কোথাও যেতে হয় এবং ফোনের ব্যাটারি শেষের দিকে চলে আসে, তাহলে এয়ারপ্লেন মোড চালু করলে ফোন নেটওয়ার্ক খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেয়। ফলে ব্যাটারি তুলনামূলক ধীরে শেষ হয়। তবে চার্জ করার সময় এর সুবিধা খুব সীমিত।
চার্জিংয়ে আসলে কতটা সময় বাঁচে?
বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, চার্জিংয়ের সময় এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখলে ফোন সম্পূর্ণ চার্জ হতে গড়ে মাত্র ৪ থেকে ১১ মিনিট কম সময় লাগে। পুরোনো স্মার্টফোন কিংবা আধুনিক দ্রুত চার্জিং সমর্থিত ফোন—উভয় ক্ষেত্রেই এই পার্থক্য প্রায় একই।
অর্থাৎ, খুব জরুরি মুহূর্তে কয়েক মিনিট বাঁচানোর প্রয়োজন হলে এয়ারপ্লেন মোড কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
তবে এর বিনিময়ে চার্জ চলাকালীন ফোনটি দিয়ে কল করা, মেসেজ গ্রহণ, ইন্টারনেট ব্যবহার বা অনলাইন কোনো কাজ করা সম্ভব হবে না।
আরও দ্রুত চার্জ করতে কী করবেন?
চার্জিংয়ের সর্বোচ্চ গতি পেতে চাইলে এয়ারপ্লেন মোডের ওপর নির্ভর না করে ভালো মানের চার্জিং সরঞ্জাম ব্যবহার করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। বর্তমানে অধিকাংশ স্মার্টফোন দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি সমর্থন করলেও অনেক নির্মাতা ফোনের সঙ্গে উপযুক্ত চার্জিং অ্যাডাপ্টার দেয় না।যেমন, স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২৬ আল্ট্রা বা আইফোন ১৭ সিরিজের ফোনগুলোর বক্সে কোনো চার্জিং অ্যাডাপ্টারই থাকে না।
অথচ আইফোন ১৭ সিরিজের ফোনগুলোতে ৪০ ওয়াট পর্যন্ত দ্রুত চার্জিং সাপোর্ট করে এবং আইফোন এয়ার-এ ২০ ওয়াট। ফলে ফোনের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ চার্জিং স্পিড দেখে নিয়ে সেই অনুসারে শক্তিশালী পাওয়ার ব্লক কিনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফোন যদি ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তি ‘চি টু’ সাপোর্ট করে তবে গতি বাড়াতে ‘চি টু’ মানের ওয়্যারলেস চার্জার ব্যবহার করতে পারেন।
এ ছাড়া, যে কোনো সাধারণ ‘ইউএসবি-এ’ থেকে ‘ইউএসবি-সি’ কেবল বদলে ‘ইউএসবি-সি’ থেকে ‘ইউএসবি-সি’ ফাস্ট-চার্জিং কেবল ব্যবহার করলে চার্জ দ্রুত হয়। কেবলের গুণমানও যেহেতু চার্জিং স্পিডে সরাসরি প্রভাব ফেলে ফলে সবসময় বিশ্বস্ত ও ভালো কোনো ব্র্যান্ডের চার্জিং কেবল ব্যবহার করা উচিত।
ছাড় দেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়
চার্জে রাখা অবস্থায় ফোন ‘এয়ারপ্লেন মোড’-এ রাখলে বিশেষ কোনো সুবিধা মিলবে না ঠিকই। তবে এর ভালো দিক হচ্ছে, মোডটি ব্যবহারকারীকে ঘনঘন স্ক্রিন জ্বালিয়ে মেসেজ চেক করা বা সামাজিক মাধ্যম স্ক্রল করা থেকে বিরত রাখবে। এয়ারপ্লেন মোড অন না করেও যদি চার্জিংয়ের সময় ফোন ব্যবহার করা বন্ধ রাখতে পারেন তাহলে ফোন দ্রুতই চার্জ হবে। কোনো দরকারি নোটিফিকেশন এলে তা স্ক্রিনের প্রিভিউতে বা স্মার্টওয়াচে দেখে নিন।
জরুরি কিছু না হলে ফোন আনলক করার দরকার নেই। কারণ, চার্জে থাকা অবস্থায় স্ক্রিনের আলো যত বেশি জ্বলবে ও ফোন যত বেশি ব্যবহার করবেন, চার্জিংয়ের গতি ততই ধীর হবে। এয়ারপ্লেন মোড অন রাখা অবস্থায় যদি হঠাৎ কোনো জরুরি কল বা মেসেজ আসে? ব্যাটারির সামান্য সাশ্রয়ের জন্য এ ঝুঁকি নেওয়া একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ফলে চার্জিংয়ের সর্বোচ্চ গতি পেতে ভালো মানের কেবল ও শক্তিশালী অ্যাডাপ্টারে বিনিয়োগের পাশাপাশি ভালো পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখতে পারেন। চার্জের জন্য এক ঘণ্টার মতো সময় ধরে ফোনকে অকেজো বা নিষ্ক্রিয় বানিয়ে রাখার চেয়ে সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক রাখা বেশি কার্যকর সমাধান।
আয়শা/০২ অগাস্ট ২০২৬,/রাত ১১:২৫
