উরুমকির রক্তাক্ত জুলাই, ১৭ বছর পরও যেসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি

Ayesha Siddika | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৬ - ০২:৩০:৪৬ এএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ২০০৯ সালের ৫ জুলাই। চীনের জিনজিয়াংয়ের রাজধানী উরুমকিতে চীনা সরকারের হামলায় ১৯৭ জন নিহত ও এক হাজার ৭২১ জন আহত হন। দুই উইঘুর হত্যার প্রতিবাদে হাজারও মানুষ বিক্ষোভে নামে। সেখানে চীনা সরকার তাদের ওপর হামলা চালায়। এরপর উইঘুর পরিচালিত মসজিদগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। 

বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় ৪০০ জনেরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। তাদের ৯ জনকে মৃত্যৃদণ্ড দেয়া হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কমপক্ষে ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৭ বছর পার হয়ে গেলেও ২০০৯ সালের ৫ জুলাইয়ের উরুমকি হত্যাকাণ্ডের ক্ষত আজও শুকায়নি, বরং সেদিন উত্থাপিত প্রশ্নগুলো আজো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। 

উইঘুরদের সাম্প্রতিক ইতিহাস অনুধাবন এবং সমসাময়িক চীনের অন্যতম সবচেয়ে প্রভাবশালী ও পরিবর্তনের বাঁক হিসেবে এই ঘটনাকে বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। ​কেন উইঘুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষ পর্যন্ত রক্তপাতে রূপ নিয়েছিল? কেন শাওগুয়ানে উইঘুর শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ডের কেন কোনো স্বচ্ছ তদন্ত হলো না? 

কেন উইঘুর বুদ্ধিজীবীদের বারবার দেওয়া সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করা হলো? এবং কেন কর্তৃপক্ষ আলোচনার পথ পরিহার করে দমনের পথ বেছে নিল? ​এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ৫ জুলাইয়ের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি ছিল না। এমনকি এটি উইঘুর সংকটের শুরুও ছিল না। বরং এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন দশকের পর দশক ধরে চলা অমীমাংসিত অন্যায়, পদ্ধতিগত বৈষম্য এবং regional autonomy বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের নামে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আর আড়াল করা সম্ভব হয়নি।

​তাই ৫ জুলাইকে বুঝতে হলে শুধু সেই একটি দিনের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর আগের পটভূমি এবং কেন এটি প্রতিরোধের প্রতিটি সুযোগ হাতছাড়া করা হয়েছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

​ট্র্যাজেডির পটভূমি

​৫ জুলাইয়ের এই ট্র্যাজেডি হঠাৎ করে ঘটেনি। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে, ২০০৯ সালের মার্চ মাসে উইঘুর অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী ইলহাম তোহতি এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সতর্ক করেছিলেন যে, উইঘুর এবং চীনা কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সম্পর্ক এক বিপজ্জনক মোড় নিচ্ছে। 

তিনি জানান, সরকারি চীনা প্রোপাগান্ডায় উইঘুরদের ক্রমবর্ধমানভাবে তথাকথিত ‘তিনটি অশুভ শক্তি’ (সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদ)-এর অংশ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে। 

তিনি আরও যুক্তি দেন যে, সংবিধানে আঞ্চলিক জাতিগত স্বায়ত্তশাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, যেখানে বাস্তবে বৈষম্য ও বঞ্চনা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। উইঘুরদের বৈধ ক্ষোভ সমাধানের পরিবর্তে এই political narrative বা রাজনৈতিক ন্যারেটিভ কেবল পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলেছে।

​দুর্ভাগ্যবশত, তার এই সতর্কবার্তা খুব একটা পাত্তা পায়নি। এর ঠিক তিন মাস পর, ২০০৯ সালের ২৬ জুন, গুয়াংডং প্রদেশের শাওগুয়ানে রাষ্ট্রীয় শ্রম কর্মসূচির আওতায় স্থানান্তরিত উইঘুর শ্রমিকরা ইন্টারনেটে ছড়ানো একটি গুজবের জেরে এক ভয়াবহ গণপিটুনির শিকার হন। কর্তৃপক্ষ এই হত্যাকাণ্ডের কোনো স্বচ্ছ তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়। বহু উইঘুরের কাছে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের চেয়েও কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা ছিল আরও বেশি উদ্বেগজনক।

​এই চরম ক্ষোভ ও অস্থিরতার পটভূমিতেই, ৫ জুলাই উরুমকির পিপলস স্কোয়ারে উইঘুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের আয়োজন করে। তাদের দাবি ছিল অত্যন্ত সাধারণ, শাওগুয়ানে ঠিক কী ঘটেছিল কর্তৃপক্ষকে তা স্পষ্ট করতে হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বিক্ষোভটি শান্তিপূর্ণভাবেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু মোড় ঘুরে যায় তখন, যখন নিরাপত্তা বাহিনী শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক ছত্রভঙ্গ করতে শুরু করে।

​শিক্ষার্থীরা যখন চারপাশের রাস্তায় পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই দমনপীড়নের খবর দ্রুত পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মজীবী মানুষ, পথচারী কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া সাধারণ উইঘুর বাসিন্দারা যখন জানতে পারেন যে শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তখন অনেকেই পরিস্থিতি দেখতে বা খোঁজ নিতে সেখানে ছুটে যান। ফলে, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কেবল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক বিশাল গণবিক্ষোভে রূপ নেয়।

​বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়, ৫ জুলাইয়ের এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি শাওগুয়ান হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতার অস্বীকৃতি এবং সবশেষে peaceful student demonstration বা শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভের ওপর নির্মম বলপ্রয়োগ এই পুরো ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই এক চূড়ান্ত ও মর্মান্তিক পরিণতি ছিল।

​চীনের নীতি পরিবর্তন, আলোচনার পরিবর্তে স্থায়ী নজরদারি

​৫ জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেবল সেই দিনের ট্র্যাজেডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি উইঘুরদের প্রতি চীনা সরকারের নীতিগত অবস্থানের এক চূড়ান্ত ও কঠোর পরিবর্তনের সূচনা করেছিল।

​কেন শিক্ষার্থীরা peaceful protest বা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নামতে বাধ্য হলো বা কোন ক্ষোভ তাদের রাজপথে নামালো সেসব খতিয়ে দেখার পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে। শিক্ষার্থীদের তোলা মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো অর্থপূর্ণ সমাধান কখনোই করা হয়নি।

​৫ জুলাইয়ের পর কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিধিই বাড়েটি, বরং নিয়ন্ত্রণের পেছনের মূল দর্শনটাই বদলে গেছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কারণ খোঁজার বদলে, কর্তৃপক্ষ উইঘুর পরিচয়ের যেকোনো সাধারণ বহিঃপ্রকাশকেই সরাসরি ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। 

এই পরিবর্তন রাতারাতি না ঘটলেও, ৫ জুলাইয়ের ঘটনা এমন একটি শাসনপদ্ধতিকে ত্বরান্বিত করেছিল যা পরবর্তী বছরগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

​দমনপীড়নের নতুন যুগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

​পরবর্তী সময়ে ধর্ম, ভাষা, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর পদ্ধতিগত নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়। নজরদারি ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং শুরুতে যা ‘সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ হিসেবে চালু করা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের এক স্থায়ী ও সর্বগ্রাসী রূপ নেয়।

​২০১৭ সালের পর এই নিপীড়ন এক নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছায়। গণ-আটক, তথাকথিত ডিটেনশন বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, কঠোর ডিজিটাল নজরদারি, জোরপূর্বক শ্রম স্থানান্তর এবং coercive assimilation বা বাধ্যতামূলক সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ নীতি উইঘুর সমাজকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। 

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অসংখ্য স্বাধীন গবেষকের প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। 

২০২২ সালে জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, জিনজিয়াংয়ে উইঘুরসহ অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর চালানো এই নির্যাতন ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ (Crimes against Humanity) এর শামিল হতে পারে।

​২০১৭ সালের এই চরমপন্থী নীতিগুলো হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়েনি, বরং এগুলো ছিল ৫ জুলাইয়ের পর ত্বরান্বিত হওয়া শাসন ব্যবস্থারই এক ধারাবাহিক ও তীব্র রূপ। ফলে, এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ছিল না, বরং এটি এমন এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল যেখানে রাজনৈতিক সংলাপের জায়গা দখল করে নিয়েছে স্থায়ী নজরদারি, জোরজুলুম আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতি বিলুপ্ত করার প্রক্রিয়া।

​এক অমীমাংসিত ইতিহাস

​আজ ১৭ বছর পরও ৫ জুলাইয়ের সেই প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। কেন শাওগুয়ানের হত্যাকাণ্ডের কোনো স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত হলো না? কেন একটি শান্তিপূর্ণ ছাত্র বিক্ষোভের জবাব আলোচনার পরিবর্তে বুলেট দিয়ে দেওয়া হলো? কেন উইঘুর পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের বারবার দেওয়া সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে উপেক্ষা করা হলো? এই প্রশ্নগুলো কেবল অতীতের নয়, বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

​৫ জুলাইয়ের পর উইঘুরদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই নীতি কোনো শূন্যতা থেকে তৈরি হয়নি। এটি এমন এক শাসনব্যবস্থার ফসল যা বারবার জবাবদিহিতার চেয়ে দমনকে, আলোচনার চেয়ে নিয়ন্ত্রণকে এবং বৈধ ক্ষোভের সমাধানের চেয়ে জোরজুলুমকে প্রাধান্য দিয়েছে।

​তাই ৫ জুলাইকে স্মরণ করা কেবল একটি শোক পালন বা আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি বোঝার একটি প্রয়াস যে, কীভাবে একটি অমীমাংসিত অন্যায় দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হতে পারে এবং কীভাবে ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করার মানসিকতা একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলতে পারে। 

ইতিহাস সাক্ষী থাকে কী ঘটেছিল, তবে ইতিহাসের পাতায় সেই অনুচ্চারিত প্রশ্ন এবং উপেক্ষা করা সতর্কবাণীগুলোকেও সমানভাবে মনে রাখা উচিত।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক উইঘুর লেখক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার আসিয়ে উইঘুরের কলামটি ভাষান্তর করেছেন মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান 

 

আয়শা/০৭ জুলাই ২০২৬,/রাত ২:৩০

▎সর্বশেষ

ad