আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার আবহে বিশ্ব যখন নতুন সংকট সমাধানের অপেক্ষায়, তখন নেপথ্যে থেকে সবচেয়ে বড় কৌশলগত জয় তুলে নিল চীন। কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে না জড়িয়ে কিংবা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেই বেইজিং যেভাবে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজেদের আধিপত্য সুসংহত করেছে, তা এখন বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলো চীনের এই অঘোষিত বিজয়েরই প্রতিফলন।
মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি কেবল যুদ্ধের অবসান নয় বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার একটি বড় পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, বিশ্ব বাণিজ্যের বিশাল এক অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা এশীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরের সংঘাতে এই পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতির যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা চীনসহ বড় আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল। বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল এই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেখানে তারা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং কৌশলগত বিনিয়োগকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
গত এক দশকে বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও লজিস্টিক করিডোরে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক শান্তি ফেরাতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখা চীনের সেই দূরদর্শী কৌশলেরই অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিল, চীন তখন বিনিয়োগ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে এমন এক অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করেছে, যা এখন তাদের জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সুবিধা বয়ে আনছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বর্তমান সমঝোতার পেছনে থাকা বিশাল পুনর্গঠন তহবিল এবং বাণিজ্য পুনর্স্থাপনের সুযোগটি চীনকেই দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা দেবে। হরমোজ প্রণালীতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে জাহাজ ভাড়া ও বীমার খরচ কমবে, যা এশিয়ার সাপ্লাই চেইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি যে ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, তা থেকে উত্তরণের পথ তৈরির মাধ্যমে চীন কার্যত প্রমাণিত করেছে যে, আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে কেবল যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক সংযোগ এবং কৌশলগত দূরদর্শিতাই চূড়ান্ত বিজয়ের চাবিকাঠি।
এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা না দিলেও, এটি স্পষ্ট যে হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লড়াইয়ে বেইজিং নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে। ওয়াশিংটন হয়তো যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে চীন যেভাবে তাদের জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক প্রভাব সুনিশ্চিত করেছে, তা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের আরও শক্তিশালী অবস্থানের জানান দিচ্ছে। যুদ্ধের গোলাবারুদ খরচ না করেও কেবল কূটনীতি ও অর্থনীতির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে চীন আজ এক অঘোষিত বিশ্বজয়ী হিসেবে নিজেদের আবির্ভূত করেছে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
কিউটিভি/অনিমা/২০ জুন ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:১৪
