ব্রেকিং নিউজ
হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৭৪ জাতি গঠনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : প্রধানমন্ত্রী ইরাকে আইআরজিসি’র গোপন সেল, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামলা যুক্তরাষ্ট্রে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের গাড়িতে গুলি, নিহত ১ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সংঘাতের শঙ্কা, দেশজুড়ে পুলিশের সতর্কতা রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া চার্জশিট নিয়ে প্রকাশিত তথ্য সিআইডির নয় সরকার ইতোমধ্যে অনেকগুলো অঘটন ঘটিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা আসলে কত? সমঝোতার পর হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিল ইরানের ১১ বাণিজ্যিক জাহাজ সেনাবাহিনী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বপরিসরেও অবদান রাখছে : সেনাপ্রধান

বিশ্বে আমানত কমলেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড়

Ayesha Siddika | আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ - ০৮:৩৫:২৫ পিএম

ডেস্ক নিউজ : ২০২৫ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংকে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধির পরিসংখ্যান। বৈশ্বিকভাবে সুইস ব্যাংকে আমানত কমার প্রবণতা থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরেই দেশটিকে অবস্থান দিচ্ছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সারা বিশ্বে সুইস ব্যাংকে আমানত কমার প্রবণতা থাকলেও, ঠিক উলটো চিত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে।

তবে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে কারা এই টাকা সুইস ব্যাংকে জমা রেখেছেন সে তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই। সুইস ব্যাংক তার কোনো আমানতকারীর তথ্য কখনো প্রকাশ করে না। এই বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অর্থ পাচার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যদিও অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন এবং পাচার রোধ ও অর্থ ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপের তাগিদ দিচ্ছেন। 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের পতনের পরেও অর্থ পাচার থামেনি। তিনি বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কল্যাণে পাচারের প্রক্রিয়া এখন সহজ হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে সরকারকে কঠোর হতে হবে। একদিকে পাচার বন্ধ অপরদিকে আগে পাচার হওয়া টাকা ফেরানো দুদিকেই জোর দিতে হবে। না হলে এ অবস্থা থেকে মুক্তি মিলবে না।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বৈধ অনুমোদন নিয়ে কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখেনি। এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। তবে অর্থ পাচার ঠেকাতে এবং আগের পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, আইনগতভাবে যা করণীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাচারের অর্থ ফেরত আনতে সুইস ব্যাংকের সঙ্গে কোনো এমওইউ (সমঝোতা স্মারক) হয়নি। তবে অর্থ পাচারের বিষয় নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের এমওইউ আছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যখন বিদেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার জন্য নানামুখী প্রচেষ্টা চালিয়েছিল তখনই এই অর্থ পাচার হয়েছে; যা খুবই উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, সুশাসনের অভাব এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারকে উৎসাহিত করায় টাকা পাচারের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি।

সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে নানা রকম শঙ্কা বিরাজ করে। এ কারণে দেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছাড়াও সমাজের বড় মাপের কালোটাকার মালিকরা ওই সময় সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের চিন্তা করেন। ২০২৫ সাল ছিল জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর। যে কারণে পাচারের প্রবণতা বেড়েছিল।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে যা ছিল ৫৮ কোটি ৯৫ লাখ ফ্র্যাংক। ২০২৩ সালে ছিল ১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। ২০২২ সালে ছিল ৫ কোটি ৫৩ লাখ ফ্র্যাংক। তবে এর আগে ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি ৮৭ কোটি ১১ লাখ ফ্র্যাংক ছিল। এটি এ যাবতকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এছাড়াও ২০২০ সালে ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্র্যাংক।

২০১৯ সালে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৮ সালে ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্র্যাংক। ২০১৭ সালে ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ ফ্র্যাংক এবং ২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ ফ্র্যাংক। স্বর্ণালংকার, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জমা রাখলে তার আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে আমানতে যোগ হয় না।

সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে এ বছর প্রথম অবস্থানে যুক্তরাজ্য। ২০২৫ সালে দেশটির আমানতের পরিমাণ ১৮ হাজার ৩৯০ কোটি ফ্র্যাংক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি, সিঙ্গাপুর ৩ হাজার ১৫৭ কোটি, চীন ১ হাজার ২৫ কোটি ফ্র্যাংক, রাশিয়া ৮৫৯ কোটি, জাপান ৯৫৩ কোটি ও মালয়েশিয়া ২০৪ কোটি ফ্র্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আমানত ২৭ কোটি কমে ৩২৩ কোটি, পাকিস্তানের আমানত ৩৮ কোটি, নেপাল ৩১ কোটি এবং বাকি দেশের আমানত লাখের ঘর ছাড়ায়নি।

সুইস ব্যাংক মূলত তাদের প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা বিদেশিদের আমানতের তথ্য প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশি আইনে কোনো নাগরিকের বিদেশি ব্যাংকে আমানত রাখার সুযোগ নেই। টাকা নিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এখন পর্যন্ত কাউকে বিদেশে টাকা জমা রাখার বিশেষ অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। এছাড়া কোনো প্রবাসীও সরকারকে জানাননি যে, তিনি সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রেখেছেন। ফলে সুইস ব্যাংকে জমা হওয়া পুরো টাকাই দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশ থেকে টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়েছে। মূলত কয়েকটি মাধ্যমে টাকা পাচার হয়। এর মধ্যে রয়েছে আমদানিতে মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এছাড়া বড় বড় ঘুস লেনদেন হয় দেশের বাইরে ডলারে, যা পাচারকৃত টাকারই অংশ। গত কয়েক বছরে সরাসরি বিদেশে লাগেজ ভর্তি করে ডলার নিয়ে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের আর্থিক খাতের প্রকৃত অবস্থা মূল্যায়নে শ্বেতপত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে প্রধান করে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা ২৮ লাখ কোটি টাকা।

এই পরিমাণ টাকা গত ৫ বছরে দেওয়া দেশের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। আলোচ্য সময়ে প্রতিবছর পাচার হয়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৫ বছরের পাচারের অর্থ দিয়েই ৭৮টি পদ্মা সেতু করা সম্ভব। এদিকে প্রস্তাবিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পাচারের অর্থ ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দ করা শুরু হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে আলোচ্য সময়ে বিশ্বের সব দেশের আমানত কমেছে। আলোচ্য বছরে সুইজারল্যান্ডের ২৫৬টি ব্যাংকে আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংক। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে যা ছিল ৯৭ হাজার ৭১২ কোটি ফ্র্যাংক। এ হিসাবে এক বছরে আমানত কমেছে ৮ হাজার ৭৪ কোটি ফ্র্যাংক।

 

আয়শা/১৯ জুন ২০২৬,/রাত ৮:২৮

▎সর্বশেষ

ad