বিশ্বরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ : আমেরিকা থেকে কি দূরে সরে যাচ্ছে ইউরোপ

Ayesha Siddika | আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ - ০৭:৪৫:৪৪ পিএম

আন্তর্জাতিক  ডেস্ক : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে স্থিতিশীল কাঠামোগুলোর একটি ছিল ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের এই জোট শুধু সামরিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করেনি, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর সেই দীর্ঘদিনের কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। 

ইউরোপীয় নেতারা এখনো প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট ধরে রাখলেও, পর্দার আড়ালে তারা ক্রমশ নিজেদের জন্য বিকল্প নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি কাঠামো গড়ে তুলছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রান্তে ঠেলে দেওয়া বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো আবারও কূটনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছেন এবং তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতি। 
ইউরোপের আস্থার সংকট ও পরিবর্তিত সমীকরণ     
২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পর ইউরোপীয় নেতারা প্রথমে ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তার নেতৃত্বের ধরনকে সামলানোই হবে বাস্তবসম্মত পথ। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দ্রুত ওয়াশিংটন সফর এবং ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের ট্রাম্পকে প্রশংসাসূচক মন্তব্যকে দেখা হয়। 
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে ধারণা বদলাতে শুরু করে। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্কনীতি, ন্যাটো মিত্রদের প্রতি বারবার চাপ, ইউরোপীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে একতরফা সিদ্ধান্ত এবং জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের হুমকি ইউরোপে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। 
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। সংকটের মুহূর্তে ওয়াশিংটন কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে? 
‘কোয়াইট কুইটিং’ : প্রকাশ্যে মিত্রতা, ভেতরে বিচ্ছিন্নতা
কার্নেগি ইউরোপের গবেষক রিম মোমতাজ এই প্রবণতাকে বলেছেন “কোয়াইট কুইটিং” অর্থাৎ প্রকাশ্যে জোট বজায় রেখে ধীরে ধীরে নির্ভরতা কমিয়ে আনা। এর বাস্তব উদাহরণও দেখা যাচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ক্লাউড অবকাঠামোর জন্য মার্কিন অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডাব্লুউএস) বাদ দিয়ে ইউরোপীয় বিকল্প বেছে নিয়েছে। ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না কিনে ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ স্যাম্প/টি সিস্টেম গ্রহণ করেছে। 
শুধু প্রতিরক্ষা নয়, প্রযুক্তি, মহাকাশ এবং ডেটা সিকিউরিটির মতো কৌশলগত খাতেও ইউরোপ ‘ইউরোপ ফার্স্ট’ নীতি জোরদার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজস্ব ক্লাউড, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিলিয়ন ইউরোর বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। 
হরমুজ সংকট ও বৈশ্বিক আস্থার ভাঙন
ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সংকটে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে যায়, হাজার হাজার জাহাজ আটকে পড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়। 
তেলের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১১৮ ডলারে পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে শিপিং বিমা খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং অনেক দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়।
ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব আগের মতো কার্যকর ছিল না। এর ফলে শুধু ইউরোপ নয়, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও আমেরিকার নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ বাড়ছে। 
নতুন জোট ও ইউরোপীয় কৌশলগত পুনর্গঠন
এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপ নতুন ধরনের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলছে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গঠিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করছে। এতে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের মতো দেশও যুক্ত হয়েছে। 
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোটের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করছে। এর লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি করা। 
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পুনর্বিন্যাস।
লুকাশেঙ্কোর কূটনৈতিক প্রত্যাবর্তন
এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেই আলোচনায় ফিরে এসেছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে ‘শেষ স্বৈরশাসক’ হিসেবে পরিচিত এই নেতা এখন আবার পশ্চিমা কূটনীতিতে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। 
সম্প্রতি ট্রাম্প রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে সহযোগিতার জন্য লুকাশেঙ্কোকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বেলারুশের কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, বিশেষ করে সার রফতানি এবং কিছু আর্থিক খাতে সীমাবদ্ধতা কমানো হয়। 
এর ফলে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা মিনস্ক আবার কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসে।
তবে বাস্তবতা জটিল। বেলারুশে এখনো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি রাজনৈতিক বন্দি এখনো কারাগারে রয়েছে। ২০২০ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধী আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল।
সমালোচকদের মতে, লুকাশেঙ্কো বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তিকে পশ্চিমা দেশের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে এক ধরনের ধীর কিন্তু গভীর পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউরোপ এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে একমাত্র নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভরসার জায়গা থেকে দেখছে না। তারা নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। 
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা পুরনো একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। একই সময়ে কিছু বিতর্কিত রাষ্ট্র ও নেতা— যেমন লুকাশেঙ্কো নতুন কূটনৈতিক সুযোগের দরজা খুঁজে পাচ্ছেন।
বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে এক নতুন দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড় হলেও, তার প্রতি আস্থার ভিত্তি আগের মতো দৃঢ় নেই।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— আগামী দশকে বিশ্ব কি আবারও একক নেতৃত্বের অধীনে থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিগুলো আলাদা আলাদা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে? 

 

 

আয়শা/৩১ মে ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:৪০

▎সর্বশেষ

ad