আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যকার সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠকটিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্পের নিজস্ব উপদেষ্টারাই ভিন্ন সুর গাইছেন। তাদের আশঙ্কা, এই বৈঠকের ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে তাইওয়ান এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
উপদেষ্টাদের উদ্বেগের কারণ কী?
ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পরিবেশ আপাতদৃষ্টিতে বেশ উষ্ণ মনে হলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মহল বেইজিংয়ের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা অ্যাক্সিওসকে জানান, শি জিনপিং বিশ্বমঞ্চে চীনকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। ওয়াশিংটনকে বেইজিংয়ের বার্তা স্পষ্ট— আমরা কোনো উদীয়মান শক্তি নই, আমরা আপনাদের সমান সমান। আর তাইওয়ান আমাদের। ওই উপদেষ্টা বলেন, এ সফরের পর আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাইওয়ান ইস্যুটি সামনে চলে আসার আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে এর প্রভাব কেমন হতে পারে, তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে আমরা এর জন্য একেবারেই প্রস্তুত নই। আমাদের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ সরবরাহের চেইনও স্বনির্ভর হতে আরও অনেক সময় লাগবে। করপোরেট সিইও এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য চিপ সরবরাহের সংকটের চেয়ে বড় কোনো মাথাব্যথা এ মুহূর্তে নেই।
ট্রাম্পের ‘নেগোশিয়েটিং চিপ’ মন্তব্য ও তাইওয়ানের অস্বস্তি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের কিছু মন্তব্যও তার ঘনিষ্ঠ মহল এবং তাইওয়ানের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চীন সফর শেষে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাইওয়ানের কাছে একটি পেন্ডিং অস্ত্র বিক্রির চুক্তিকে বেইজিংয়ের সাথে দরকষাকষির ‘হাতিয়ার’ বা ‘নেগোশিয়েটিং চিপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তাইওয়ানের জন্য আটকে থাকা ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি তিনি অনুমোদন করবেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি চীনের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্পের ভাষায়, আমি এটি স্থগিত রেখেছি, এটি চীনের ওপর নির্ভর করছে। সত্যি বলতে, এটি আমাদের জন্য একটি দারুণ দরকষাকষির হাতিয়ার। এখানে প্রচুর অস্ত্র রয়েছে।
এর আগে গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প এবং মার্কিন কংগ্রেস তাইওয়ানের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল। যার প্রতিক্রিয়ায় চীন তাইওয়ানের চারপাশে লাইভ-ফায়ার সামরিক মহড়া চালায়। এই শীর্ষ বৈঠকের সময় চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে ‘চীন-মার্কিন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এছাড়াও, তাইওয়ানের বিশ্বখ্যাত মাইক্রোচিপ শিল্পকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত করার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প তাইপেইকে বেশ চমকে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি দেখতে চাই তাইওয়ানের চিপ নির্মাতারা সবাই আমেরিকায় চলে আসুক। এটিই হবে সবচেয়ে দারুণ কাজ।
তাইওয়ানের পালটা জবাব ও অনড় অবস্থান
ওয়াশিংটন থেকে আসা এসব মন্তব্যের জবাব দিতে দেরি করেনি তাইপেই। তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে শনিবার (১৬ মে) জানানো হয়েছে যে, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি ও অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক নাম ‘রিপাবলিক অব চায়না’ উল্লেখ করে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র কারেন কুও বলেন, রিপাবলিক অব চায়না একটি সার্বভৌম, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ; এটি স্বতঃসিদ্ধ। ফলে বেইজিংয়ের দাবিগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তবে তাইওয়ান এখনো ট্রাম্পের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ এবং মার্কিন আইন অনুযায়ীই তাইওয়ানকে অস্ত্র দেওয়া আমেরিকার দায়িত্ব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মূলত ট্রাম্পের একটি বক্তব্যের জবাবেই এই প্রতিক্রিয়া জানায় তাইপেই। ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করার পক্ষে নন। ট্রাম্প বলেন, আমি চাই না কেউ স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। তাছাড়া, একটি যুদ্ধের জন্য আমাদের ৯,৫০০ মাইল পাড়ি দিতে হবে। আমি তেমন কিছু চাচ্ছি না।
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতার সরাসরি বিরোধিতাও করে না। এই সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্যটিই ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আয়শা/ ১৭ মে ২০২৬,/রাত ১০:৪৪
