চীনের মেদোগ বাঁধ: ঝুঁকি মোকাবেলায় জাপান ও ভারতের আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন

Ayesha Siddika | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ - ১১:১৪:০১ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গত আগস্টে হিমালয় অঞ্চলে ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী বন্যা এশিয়ার সামনে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরেছে: বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পর্বতমালায় নির্মিত অবকাঠামো জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূরের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। নেপালে উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ধ্বংসাত্মক ঘটনায় ধ্বংসাবশেষ ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি ভাটিতে ভেসে এসে অবকাঠামোর ক্ষতি করে। এটি প্রমাণ করে যে কীভাবে একটি স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক বিপর্যয় দ্রুত একটি আঞ্চলিক জরুরি অবস্থায় রূপ নিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে, তিব্বতের ইয়ারলুং তসাংপো নদীতে চীনের বিশাল মেদোগ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ আন্তর্জাতিক মনোযোগ দাবি করে। জাপানের জন্য, যার অবকাঠামো বিনিয়োগ ও ভারতের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব ক্রমশ দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে, মেদোগ প্রকল্প একটি ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

প্রায় ৬০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার পরিকল্পনা নিয়ে মেদোগ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প হতে যাচ্ছে। পূর্ব হিমালয় সিনট্যাক্সিসের নামচা বারওয়া পর্বতমালার কাছে অবস্থিত এই প্রকল্পটি একটি ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে জটিল এলাকায় অবস্থিত, যা সক্রিয় ফাটল (faults), খাড়া ঢাল, হিমবাহ, ভূমিধস এবং নদীর তীব্র স্রোতের জন্য পরিচিত।

ইয়ারলুং তসাংপো নদীটি ‘সিয়াং’ নামে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করেছে, তারপর ব্রহ্মপুত্র নদী ব্যবস্থার সাথে মিশে অবশেষে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। বেইজিং যেটিকে একটি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে, তা ভারত, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় জাপানের প্রসারিত কৌশলগত স্বার্থের ওপর উল্লেখযোগ্য আন্তঃসীমান্ত প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে মূল উদ্বেগের বিষয় শুধু এটি নয় যে চীনা প্রকৌশলীরা একটি কারিগরিভাবে উন্নত বাঁধ তৈরি করতে পারবেন কিনা, বরং এর চারপাশের পর্বত, হিমবাহ, জলাধার এবং নদী ব্যবস্থা একাধিক দুর্যোগ সহ্য করতে পারবে কিনা। ২০১৭ সালের নিংচি ভূমিকম্পে ১,৮০০টিরও বেশি ভূমিধস ঘটে এবং সাময়িক কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়, যা ধারাবাহিক ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকির প্রতি এই অঞ্চলের সংবেদনশীলতাকে নির্দেশ করে।

মেদোগের কাছে কোনো ভূমিকম্প হলে তা পাহাড়ের ঢালকে অস্থির করে তুলতে পারে, নদীর পথ অবরুদ্ধ করতে পারে বা বিপুল পরিমাণ পানি স্থানচ্যুত করতে পারে। ১৯৬জ্ঞ সালে ইতালির ভাজন্ট বিপর্যয় দেখিয়েছিল যে একটি বাঁধের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোগত ধস না হয়েও মারাত্মক বন্যা হতে পারে। এই সম্ভাবনাগুলো স্বাধীন ভূমিকম্পন সংক্রান্ত মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ পরিবেশগত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে অপরিহার্য করে তোলে।

জলবায়ু পরিবর্তন এই ঝুঁকিগুলোকে আরও জটিল করে তুলছে। হিমালয়ের হিমবাহগুলো সংকুচিত হচ্ছে, হিমবাহজাত হ্রদগুলোর আয়তন বাড়ছে এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তিত ধরন পার্বত্য জলবায়ুর অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। উষ্ণায়ন, অস্থির ঢাল, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং বড় আকারের জলবিদ্যুৎ নির্মাণের যৌথ প্রভাব এমন ঝুঁকি তৈরি করে যা প্রথাগত প্রকৌশল গণনায় পুরোপুরি ধরা নাও পড়তে পারে।

মেদোগ বাঁধটি যে নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবে এমন কোনো প্রমাণ নেই, তবে কোনো চরম বিপর্যয়ের সম্ভাব্য পরিণতি এড়াতে সতর্কতামূলক আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রকৌশলগত সুরক্ষার বিষয়ে বেইজিংয়ের আশ্বাস কখনোই স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে না—বিশেষ করে যখন প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে পরিচালন সংক্রান্ত তথ্যের অভাব রয়েছে।

ভারতের জন্য এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে অরুণাচল প্রদেশ ও আসামে, যেখানে ব্রহ্মপুত্র নদী কৃষি, পরিবহন, জীববৈচিত্র্য এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রেখেছে। নদীর পানিপ্রবাহে আকস্মিক পরিবর্তন জনবসতি, সেতু, সড়ক, সেচ ব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

পলির গতিপ্রকৃতিতে পরিবর্তন নদীর পথ, কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং বিপন্ন গঙ্গা নদীর ডলফিনের আবাস্থলসহ জলজ বাস্তুতন্ত্রকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশ বন্যা, পলির প্রাপ্যতা, নদীভাঙন এবং স্বাদু পানির নিরাপত্তা সংক্রান্ত অতিরিক্ত অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। এর পরিণতি কোনো পূর্বনির্ধারিত দুর্যোগের পরিস্থিতির ওপর নয়, বরং জলাধার পরিচালনা, ঋতুভিত্তিক পরিস্থিতি এবং ভাটির হাইড্রোলজিক্যাল গতির ওপর নির্ভর করবে।

মেদোগের গুরুত্ব কেবল পানি নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে অবকাঠামোগত সংযোগ কৌশলের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, যেখানে জাপান একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মাধ্যমে টোকিও এই অঞ্চলজুড়ে সড়ক সংযোগ, টেকসই উন্নয়ন এবং অবকাঠামো আধুনিকীকরণে সহায়তা করেছে। সড়ক উন্নয়ন এবং অন্যান্য সংযোগ উদ্যোগগুলো ভারতের সার্বিক অর্থনীতির সাথে উত্তর-পূর্ব ভারতকে সমন্বিত করার ক্ষেত্রে জাপানের অঙ্গীকার প্রকাশ করে। এই বিনিয়োগগুলো ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ এবং উভয় দেশের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ যৌথ দূরদৃষ্টিকেও সমৃদ্ধ করে।

এই কৌশলগত ভূগোলে অরুণাচল প্রদেশ একটি বিশেষ সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। যদিও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সেখানে জাপানের সরাসরি অবকাঠামোগত সম্পৃক্ততা সীমিত, তবে প্রতিবেশী উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অরুণাচল প্রদেশকে আসাম, ভারতের অন্যান্য অংশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্তকারী বৃহত্তর নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করে।

এই বিনিয়োগগুলোর মূল্য কেবল রাস্তা এবং সেতুর ওপর নির্ভর করে না, বরং ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ওপরও নির্ভর করে। তীব্র বন্যা, পরিবর্তিত পলিপ্রবাহ বা দীর্ঘস্থায়ী পানিসম্পদ সংক্রান্ত বিঘ্ন পরিবহন করিডোর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়াতে পারে, বাণিজ্য ব্যাহত করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।

একতরফা সিদ্ধান্ত যখন আঞ্চলিক সংযোগের পরিবেশগত ভিত্তিকেই হুমকির মুখে ফেলে, তখন এশিয়ার উদীয়মান অবকাঠামো নেটওয়ার্ক কি টেকসই থাকতে পারে? জাপান ও ভারত অর্থনৈতিক সংহতিনাম, উন্নয়ন সহায়তা এবং কৌশলগত সহযোগিতার মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। মেদোগ এখানে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে: হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সহনশীলতা তৈরি করা। কেবল প্রকল্পগুলো ভারতে অবস্থিত বলেই টোকিওর বিনিয়োগকে সমগ্র হিমালয় অববাহিকার প্রভাব থেকে আলাদা রাখা যাবে না।

ভূমিকম্প-সহনীয় প্রকৌশল, দুর্যোগ প্রস্তুতি, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রযুক্তিতে জাপানের উল্লেখযোগ্য দক্ষতা রয়েছে। এই সক্ষমতাগুলোকে ভারত-জাপান সহযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ের মূল উপাদান করা উচিত। দুই দেশ একটি ‘হিমালয় অবকাঠামো সহনশীলতা উদ্যোগ’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যেখানে স্যাটেলাইট মনিটরিং, ভূমিকম্পের ঝুঁকি মূল্যায়ন, হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ, হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং এবং জলবায়ু-সহনশীল ডিজাইন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

জাপানি অর্থায়ন এবং কারিগরি দক্ষতা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাজুড়ে মজবুত সেতু, সহনশীল পরিবহন করিডোর, নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বাস্তব সময়ের বন্যা পূর্বাভাসে সহায়তা করতে পারে। এই ধরনের সহযোগিতা দুর্যোগ প্রস্তুতিকে ‘ভারত-জাপান বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের’ একটি বাস্তবসম্মত স্তম্ভে পরিণত করবে।

বাংলাদেশকেও এই প্রচেষ্টার অংশ করা উচিত। বাংলাদেশে জাপানের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন স্বার্থ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পরিবহন অবকাঠামো, শিল্প সংযোগ এবং মাতারবাড়ি উন্নয়ন উদ্যোগ। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা ভাটিতে জাপানের সহায়তাপুষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। দুর্যোগ প্রস্তুতি, অবকাঠামোগত সহনশীলতা এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে গঠিত একটি ভারত-জাপান-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় কাঠামো পরিবেশগত উদ্বেগকে সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে না ঠেলে একটি গঠনমূলক সমাধান দিতে পারে।

মেদোগ প্রকল্পটির কারণে জাপান ও ভারতের কৌশলগত সংযোগ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত। চীনের উন্নয়ন করার অধিকার রয়েছে, তবে সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত প্রভাব রয়েছে এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, আলোচনা এবং বিশ্বাসযোগ্য সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। বেইজিংয়ের উচিত সংশ্লিষ্ট হাইড্রোলজিক্যাল এবং পরিচালন সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা এবং অর্থবহ বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া।

ইতিমধ্যে, ভারত ও জাপানকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে উত্তর-পূর্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখতে হলে সেই নদী ব্যবস্থাগুলোকে রক্ষা করতে হবে যার ওপর আঞ্চলিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে। হিমালয় অঞ্চলের পরবর্তী বড় দুর্যোগটি হয়তো ভারতের সীমান্তের ওপার থেকে শুরু হতে পারে, তবে এর পরিণতি টোকিও এবং নতুন দিল্লির তৈরি করা যৌথ অবকাঠামো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

বিষয়টি চীনের উন্নয়ন বনাম তার প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার মধ্যে বেছে নেওয়ার নয়; বরং শেয়ার করা ঝুঁকিগুলো যৌথভাবে মোকাবেলা করা নাকি আলাদাভাবে মুখোমুখি হওয়া—তার ওপর নির্ভর করছে। কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আগেই মেদোগ আঞ্চলিক সহযোগিতার অভ্যাস গড়ে তোলার একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। যৌথ পর্যবেক্ষণ, সময়মতো তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত জরুরি পরিকল্পনা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে আত্মবিশ্বাস বাড়াবে।

ভারত, বাংলাদেশ এবং চীনের পাশাপাশি জাপান এই প্রচেষ্টায় অর্থায়ন ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে সহায়তা করতে পারে। এই উদ্যোগের সফলতা কেবল ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা বা প্রকৌশলের বিশালতা দিয়ে মাপা উচিত নয়, বরং ভাটির সাধারণ মানুষ যেন এটা বিশ্বাস করতে পারে যে উজান অঞ্চলের সিদ্ধান্তে তাদের সুরক্ষা ও জীবিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—তার ওপর নির্ভর করবে।

 

 

আয়শা/২০ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ১১:০০

▎সর্বশেষ

ad