ডেস্ক নিউজ : সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ তথা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারি দলের অবস্থানের সঙ্গে সুস্পষ্ট দ্বিমত নিয়ে জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত অধিবেশন ছিল বেশ উত্তপ্ত। সেই উত্তাপ এখন গড়াচ্ছে রাজপথে। বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করার প্রথম দায়িত্ব হলো যারা সরকারে আছে তাদের। সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে তা সংসদেই মীমাংসা করতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে বাঁকা পথে গিয়ে ফ্যাসিজম (কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা) বজায় রাখতে চাইলে রাজপথেই ফয়সালা হবে।
বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন সমাপ্ত হয়েছে। বাজেট ছিল এই অধিবেশনের মুখ্য বিষয়। তারপরও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পয়েন্ট অব অর্ডারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি বারবার উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারি দল পালটা জবাবও দিয়েছে। এ নিয়ে সংসদ বারবার উত্তপ্ত হয়েছে। বিরোধী দল ওয়াকআউট করে তাদের অবস্থান জানান দিয়েছে।
বিরোধী দলের অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের জন্য সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় এমপিরা সংসদ-সদস্য হিসাবে শপথ নেন। পাশাপাশি তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসাবেও শপথ নিয়েছেন। কিন্তু সরকারি দলের সংসদ-সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ নেননি। বিরোধটা সেখান থেকেই শুরু।
বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে একবার বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। একই ব্যক্তি সংসদেই আবার জুলাই সনদকে অন্তহীন প্রতারণার দলিল হিসাবে মন্তব্য করেছেন। এমন কথাও তিনি বলেছেন, গণভোটের দাবি তখন মেনে নিয়েছিলাম রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে। গণভোট মেনে না নিলে যদি নির্বাচন না হতো-এই আশঙ্কা থেকে গণভোটকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি।
এসব নিয়ে সংসদে অনেক বাগবিতণ্ডা, হইচই এবং ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষে সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দল তাতে নাম না দেওয়ায় একতরফা কমিটি হয়েছে। তারা ওয়াকআউট করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এভাবেই শেষ হয়েছে। আবার অধিবেশন বসবে দুই মাস পরে। সেই অধিবেশন হবে নিয়ম রক্ষার জন্য, যার মেয়াদ হবে অল্প কয়েকদিন। বড় কোনো এজেন্ডা সেখানে থাকবে না। সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের এই সুস্পষ্ট মতপার্থক্যই তাদের রাজপথে ঠেলে দিয়েছে।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক আলোচনা সভায় সেই ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি সংসদে আদায় না হলে রাজপথেই ফয়সালা হবে। সংবিধান সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। গণভোটের রায় মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের নামে কোনো ভাঁওতাবাজি জনগণ মেনে নেবে না।’
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকারের হাতে এখনো সুযোগ আছে। তারা সংসদেই বিষয়টি মীমাংসা করতে পারে। সংবিধান সংশোধন আর সংস্কার এক জিনিস নয়। একটা লাইন বা একটা শব্দের পরিবর্তনও হয় সংশোধনীর মাধ্যমে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোতে হাত দেওয়া যায় না। তবে সংস্কারের মাধ্যমে সেটা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে ফ্যাসিস্ট তৈরির এই সংবিধান সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার উপযোগী সংবিধান তৈরির জন্য। আমরা জনগণের রায় বাস্তবায়নে সংসদে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সরকার সেখানে তা সমাধান না করে বাঁকা পথে হাঁটছে। আমাদের বাধ্য হয়েই রাজপথে নামতে হয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংস্কার পরিষদ গঠন না করলে জনগণের ইচ্ছা অনুসারেই রাজপথের কর্মসূচি আরও জোরদার হবে।’
১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার যুগান্তরকে বলেন, সরকারের ওপর চাপ তৈরির সময় চলে যায়নি। আমরা কর্মসূচি দিয়েছি যা চলমান আছে। ধারাবাহিকভাবে তা জোরদার হবে। জুলাই সনদ বা গণভোটের রায় সরকারকে মানতেই হবে। কারণ এটা জনগণ চায়, তারাই রায় দিয়েছে। ১১ দলের আরেক শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান যুগান্তরকে বলেন, ‘সরকার যেহেতু সংবিধান সংস্কারের পথে না হেঁটে একতরফা সংশোধন কমিটি করেছে, তাতে তাদের মোটিভ স্পষ্ট। কাজেই সামনে বড় কর্মসূচি আসবে।’
তিনি বলেন, ’পূর্বঘোষণা অনুসারে আগামী শনিবার বরিশালে বিভাগীয় সমাবেশসহ ২৫ তারিখ পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি আছে। তাছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষ্যে জোটের ৩৬ দিনের কর্মসূচি চলছে। ৫ আগস্ট ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ ও গণমিছিল হবে। ২৫ জুলাইয়ের আগেই ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হবে। সেখানে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
আয়শা/১৭ জুলাই ২০২৬,/বিকাল ৫:৪০
