স্পোর্টস ডেস্ক : জাদুকর! লিওনেল মেসিকে এই বিশেষণে ঠিক কতবার বিশেষায়িত করা হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কেনই বা হবে না? পুরো ক্যারিয়ারে এমন এমন সব মুহূর্ত জন্ম দিয়েছেন তিনি, যার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানও দিতে পারেনি আজও। বিজ্ঞানকে যিনি বিবশ করে দিতে পারেন, তাকে ‘জাদুকর’, ‘অতিমানব’ ছাড়া আর কীই বা বলা চলে?
লিওনেল মেসিও তাই অবধারিতভাবেই সে তকমাটা পেয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন — আর্জেন্টাইন মহাতারকা সেটাও স্বমহিমায় রক্ষা করেছেন। তা-ও আবার এক-দুই বছর নয়, নিদেনপক্ষে বছর পনেরো তো হবেই! ফি মৌসুমে অন্তত দু-তিনটির মতো করে চোয়াল ঝুলে যাওয়া মুহূর্তের অবতারণা তিনি ঘটিয়েছেন — এখনও ঘটিয়ে যাচ্ছেন।
‘আর সবাই যা পারে না, তা-ই তিনি করে দেখান’ — জাদুকরের সংজ্ঞাটাকে যদি এভাবে একটু বিস্তৃত করা হয়, তাহলে তার মহিমা বেড়ে যায় আরও একধাপ। এমন যে কত জায়গা আছে তার! পুরস্কার, রেকর্ড — এসব অতি-বৈষয়িক হিসাব একপাশে রাখুন, সেসবে মেসি বহু আগেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন সবার। শুধু মনোযোগটা রাখুন প্রায় দুই যুগ ধরে যা খেলে যাচ্ছেন, সেখানে। খেলে যাওয়া আর প্রভাব বিস্তার করা — এ দুইয়ের মাঝে বিস্তর ফারাক।
সে কারণেই হয়তো, দ্য ডার্ক নাইট সিনেমায় হার্ভি ডেন্ট বলেছিলেন, ‘য়্যু ইদার ডাই আ হিরো, অর য়্যু লিভ লং এনাফ টু সি ইয়োরসেল্ফ বিকাম দ্য ভিলেন’ — যার বাংলাটা দাঁড়ায় প্রায় এমন, ‘হয় নায়ক হিসেবে মরে যাও, নয়তো লম্বা সময় বেঁচে থেকে নিজেকে খলনায়ক বনে যেতে দেখো!’
ফুটবলে এমন নজির আছে বেশুমার। তার বন্ধু লুইস সুয়ারেজ, কিংবা তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারের দিকে তাকালেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু মেসি? তিনি তো সে পরীক্ষাতেও উতরে যাচ্ছেন অবলীলায়। ২০০৬ বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছেন সামান্যই। ২০০৭ কোপা আমেরিকায় খেলেছেন, সেখানে জিতেছিলেন সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার। পরের বছর থেকেই ছিলেন ব্যালন ডি’অরের আলোচনায়। প্রায় দুই দশক পর যখন ইউরোপ ছাড়লেন, তখন তার হাতে শোভা পেয়েছে একটা ব্যালন ডি’অর। মার্কিন মুল্লুকে গিয়ে ফুরিয়ে গেছেন — এমন একটা আলাপ চলছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে থেকেই। তার পাঁড় সমর্থকটিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন সে আলাপ।
সব ভুল ভাঙল বিশ্বকাপ শুরুর পর। ৮ গোল করে, আরও ৪টি করিয়ে মেসি তার ক্যারিয়ারের সেরা বিশ্বকাপটা কাটিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সে এসে। বিশ্বাস করুন আর নাই বা করুন, সেই বিশ্বকাপে তার চেয়ে বয়সে ছোট কোচই ছিলেন একজন, তিনি জার্মানির ডাগআউটে থাকা কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান। সেই বয়সেবিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত, ব্যালন ডি’অরের আলাপে আছেন এখনও।
-6a96fb94474c1.jpg)
সবাই যে বয়সে ফুরিয়ে যায়, সে বয়সেও তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, ছাপ ফেলেছেন পরিসংখ্যানে। শুরুতে যে সংজ্ঞার কথা বললাম, সে মানদণ্ডে এটাও তো একটা জাদুই বটে!
—
তবে এসব ‘জাদু’ বড্ড বেশি মানবিক, তাই না? যদি ঝাড়ুতে চড়ে উড়ে বেড়াতেই না পারলেন, যদি পানিকে মদ বানিয়ে ফেলতে না পারলেন, যদি সময়ের পথ ধরে উলটোদিকে হেঁটে অতীতে পা-ই না রাখতে পারলেন — তাহলে তিনি আর ‘জাদুকর’ হলেন কী করে?
এই মানদণ্ড সামনে আনলে মেসি আর ‘জাদুকর’ থাকেন না। বনে যান নেহায়েতই রক্তমাংসে গড়া মানুষ, বা ‘মাগল’। লিওনেল মেসি বোধ করি সে জাদুকর হতে না পারার আফসোসটা নিয়েই লিখেছেন বিদায়ের চিঠিটা।
আপনি এখন বলতেই পারেন, ‘বললেই হলো? মেসির মনের কথা জানলেন কী করে?’ — সেটা বোঝা গিয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পরও খেলে যাওয়ার ঘোষণা থেকেই। সম্ভব হলে মেসি খেলতেন আরও অগুণতি বছর। আর্জেন্টিনা থেকে যে ভালোবাসাটা ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে পেয়েছেন তিনি, তা আরও বহু বছর তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে তবেই না মন ভরত তার। এমন ভালোবাসা কি দু-চার বছরে উপভোগ করে সাধ মেটে?
—
মেসি যখন তার তিন পাতার দীর্ঘ বিদায়বার্তাটা লিখে প্রকাশ করলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, তার কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ — জাদুর স্কুল হগওয়ার্টসে ফেরার দিন। হ্যারি পটার ফ্র্যাঞ্চাইজির বিশাল ফ্যানডমের কাছে দিনটা তাই বাড়তি তাৎপর্যপূর্ণ। সে ফ্যানডমে মেসি আর তার স্ত্রী আন্তোনেল্লা রুকোজ্জুরও নিয়মিত বিচরণ। বহুবার তারা জানিয়েছেন জাদুকর হ্যারি, রন উইজলি আর হারমায়নি গ্রেঞ্জারের প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা।
মেসি যখন তিন পাতার চিঠির ছবিটা প্রকাশ করলেন, সেখানেও দেখা মিলল হ্যারি পটার সিরিজের প্রতি সে ভালোবাসার। মেসি যে সোনালি কলমে চিঠিটা লিখলেন, তার খাপের গায়ে দেখা গেল অদ্ভুত একটা কারুকাজ। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সে কারুকাজের শিকড় পোঁতা হগওয়ার্টসে — হারমায়নির গলায় ঝুলতে থাকা ‘টাইম টার্নার’ নামের গ্যাজেটটার আদলে গড়া সেই নকশা।

মেসির আফসোসের গভীরতাটা আঁচ করা যায় সে ‘টাইম টার্নারের’ কাজের ধরনটা মনে করলে। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য প্রিজনার অব আজকাবান’-এ অ্যালবাস ডাম্বলডোরের পরামর্শে হারমায়নি হ্যারিকে নিয়ে ব্যবহার করে সে টাইম টার্নার — তিনবার ঘোরাতেই এক দিন করে পিছিয়ে যায় সময়। সেটা কাজে লাগিয়ে নিরীহ প্রাণী বাকবিক আর হ্যারির বাবা জেমসের বন্ধু সিরিয়াস ব্ল্যাককে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে দুজনে। মোদ্দাকথা, টাইম টার্নারের কাজ মূলত সময়কে পেছনের দিকে হাঁটতে বাধ্য করা।

আর্জেন্টাইন মহানায়ক তার বিদায়ের বার্তাটা লিখলেন সে কলমে। চিঠির পাশে টাইম টার্নারের কারুকাজ-খচিত কলমটা রেখে কী বোঝাতে চাইলেন তিনি? মনে মনে কি বলছিলেন, ‘ইশ, বাস্তবেও যদি একটা টাইম টার্নার থাকত!’ নাকি ‘ইশ! সত্যিই যদি জাদুকর হতাম’?
—
২১ বছর। একজন ফুটবলারের জন্য সময়টা নেহায়েতই কম নয়। কত গুণিজনের ক্যারিয়ার তার অর্ধেকেরও আগে শেষ হয়ে গেছে! মেসি সে তুলনায় ঢের বেশি খেলেছেন, জিতেছেন, অর্জনও করেছেন।
কিন্তু যে মোহ, যে মায়া তিনি রেখে গেছেন ফুটবলের পিচে — সেসব কি এক জনম দেখে সাধ মেটে? মেটে না। আর তাই টাইম টার্নারটা আসলে মেসির প্রয়োজন ছিল না — প্রয়োজন ছিল আমাদের। ঘুরিয়ে আরেকবার নিয়ে যাওয়া যেত যদি ২০০৮, কিংবা ২০১৪, কিংবা সেই মায়াবী ৩৯ বছর বয়সের বিশ্বকাপেই, তাহলে হয়তো এই বিদায়টা এত দ্রুত আসত না।
মেসি জাদুকর নন, ঠিকই। কিন্তু জাদুকর না হয়েও তিনি এমন কিছু রেখে গেলেন, যা কোনো টাইম টার্নার ফিরিয়ে দিতে পারবে না — স্মৃতি। আর স্মৃতি তো সময়ের হাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে পুরনো জাদু। সেই জাদুতেই তিনি থেকে যাবেন, মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পরও। মাগলদের পৃথিবীতে এইটুকুই বা কম কীসে!
আয়শা/০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ১১:২৪
