ডেস্ক নিউজ : সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে বিরোধী দলের বিরোধিতার সমালোচনা করে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বিরোধী দলের সদস্যরা শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে বিলটির বিরোধিতা করেছেন। অথচ তাদের (জামায়াতের) নির্বাচনি ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর কোনো ঘোষণা ছিল না। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
অধিবেশনে পাস হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোর মধ্যে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল’-এর বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন চিফ হুইপ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানকে সম্পদ দান বা হস্তান্তর করলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওই সম্পদ ভোগদখলের অধিকার তাদের থাকবে। সন্তান সম্পদ নেওয়ার পর যাতে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বা অসহায় অবস্থায় ফেলে দিতে না পারে, সে লক্ষ্যেই আইনটি করা হয়েছে।
মা-বাবার প্রতি সম্মানের বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার সুরক্ষায় করা আইনের বিরোধিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন নিয়েও বক্তব্য দেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেব নিজেও গুমের শিকার হয়েছিলেন। তার ভাষ্য, প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসা ১৩৩টি আইনের মধ্যে ১৬টি আইন সংসদীয় পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব আইনকে আরও শক্তিশালী বিলে রূপান্তর করা হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে ১৬ বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইনজীবী, বিচারক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামতও নেওয়া হয়েছে। নতুন মানবাধিকার বিলে আগের ‘অনূর্ধ্ব ১০ বছর’ শাস্তির বিধান বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট সর্বনিম্ন শাস্তির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না বলেও উল্লেখ করেন চিফ হুইপ।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বিপরীতে গত পাঁচ মাসে ২০৫ কোটি ডলার ঋণ ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করেছেন বলেও জানান তিনি। এমপি-মন্ত্রীদের রসিদ ছাড়া বিল পরিশোধ না করা, সাধারণ পোশাক ও জীবনযাপন এবং সরকারি প্রটোকল কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ।
সরকারি খাবারের ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আগে বছরে যেখানে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খাবারের বিল হতো, সেখানে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ নিয়ে আগের সরকারের চুক্তির সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, একটি ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে।
তিনি বলেন, বিগত সরকার আদানি গ্রুপের সঙ্গে অসম চুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১৭ শতাংশ বৈদেশিক নির্ভরতা তৈরি করেছিল। বিদ্যুৎ না পেলেও বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল এবং বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের আগের ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেন চিফ হুইপ।
কৃষি খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষকদের সুদসহ ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক কৃষক উপকৃত হয়েছেন। দুই কোটি পরিবারের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, দেশে সারের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন। এর বিপরীতে বর্তমানে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন অতিরিক্ত সার মজুত রয়েছে। তবে বিতরণে সাময়িক সমস্যার জন্য বিগত সরকারের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার সার ডিলার পলাতক থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাদের কেউ কেউ কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করেন।
কৃষি উৎপাদন বাড়াতে খাল খননের সিদ্ধান্তের কথাও জানান চিফ হুইপ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ তুলে চিফ হুইপ বলেন, সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে তিনি ফার্মগেট থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত রাস্তার পাশে শত শত লাশ পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় এবং খাদ্য রপ্তানি শুরু করে। বর্তমানে কৃষক কার্ডের পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড এবং ইমামদের ভাতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক এবং চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিভিন্ন চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে। অর্থ পাচার রোধ এবং দেশের আর্থিক সুরক্ষার জন্য অর্থমন্ত্রী ১৮(ক) ধারা বাতিল করেছেন বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন জনসভার বক্তব্য তুলে ধরে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন- তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি পুরো দেশের প্রধানমন্ত্রী। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যার কারণে জনগণের কষ্টের জন্য প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি থাকলে তা ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সংসদে বাক্স্বাধীনতা চর্চার পাশাপাশি শালীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন চিফ হুইপ। সরকার ও বিরোধী দলকে গণতন্ত্র পুনর্নির্মাণ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে হুইপ অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মো. আখতারুজ্জামান মিয়া ও এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান উপস্থিত ছিলেন।
আয়শা/১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/বিকাল ৫:০৫
