আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও চীন থেকে ওষুধ, গাড়ি, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ সামরিক সরঞ্জাম কিনছে ইরান। কিন্তু তেলের বিনিময়ে কিভাবে এটি সম্ভব হয়েছে? বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এক ধরনের ‘ক্রেডিট’ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে তেহরান।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও আরও তিনজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গোপন এই ব্যবস্থায় ইরানের তেলের বিনিময়ে চীন থেকে পণ্য আমদানির জন্য ক্রেডিট দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানোর মধ্যে এই ব্যবস্থা তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করছে।
সূত্রগুলো বলছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনও লাভবান হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশটি কম দামে ইরানি তেল কেনার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা কোম্পানি ও ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক নজরদারি এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে পারছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। ওই বছর চীনে ইরানের তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল। তবে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কয়েকটি ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কঠোর ব্যবস্থা নিতে এখনো পিছিয়ে আছে ওয়াশিংটন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহার না করে ইরান-চীন বাণিজ্য পরিচালনার জন্য একাধিক মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের দাবি, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একজন ক্রেতা প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার চীনের একটি অখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা দিতেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম বলা হয়েছে ‘চুশিন’।
এই অর্থের একটি বড় অংশ ইরানে অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। বাকি অর্থ রাখা হয় একটি ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ বা SPV-তে। পরে ইরানে পণ্য সরবরাহকারী চীনা কোম্পানিগুলোর অর্থ পরিশোধে ওই অর্থ ব্যবহার করা হয়। সূত্রগুলোর হিসাবে, গত এক বছরে এই SPV-এর মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার অর্থ প্রবাহিত হয়েছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান ওষুধ, গাড়ি এবং যোগাযোগ সরঞ্জাম আমদানি করেছে। এমনকি গত এক বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা অন্তত একবার ব্যবহার করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে রয়টার্স এসব কথিত লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
‘দায় অস্বীকারের সুযোগ’ রাখছে চীন
এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে চীনকে চাপে ফেলা যাবে না—এটি দেখাতেই বেইজিং এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।
তবে চীনের নেতারা নিজেদের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান না। ঘিসেল্লির বলেন, তারা এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে প্রয়োজনে দায় অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনে বর্ণিত ব্যবস্থার বিষয়ে অবগত নয়। একই সঙ্গে তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি নেই এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেই—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন। ইরান ও চীন দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার। দুই দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে একতরফা ও অবৈধ বলে সমালোচনা করে আসছে।
এদিকে ইরানের ওপর মার্কিন চাপ আরও বাড়ছে। ওয়াশিংটন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অর্থের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই তেহরান-চীন বাণিজ্যে ব্যবহৃত এই গোপন আর্থিক ব্যবস্থা নতুন করে আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে।
আয়শা/১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:১২
