মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের সংকট-সম্ভাবনা নিয়ে হাইকমিশনে জামায়াত নেতার বৈঠক

Ayesha Siddika | আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৮:৪৫:৩১ পিএম

ডেস্ক নিউজ : মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাসপোর্ট জটিলতা, বন্দিদের আইনি সহায়তা, শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা, দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হাইকমিশনে পৌঁছালে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানকে স্বাগত জানান রাজনৈতিক কাউন্সেলর ও হেড অব চ্যান্সারি প্রণব কুমার ভট্টাচার্য। বৈঠকে অধ্যাপক মুজিবুর রহমান মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রবাসীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকমিশনের কোনো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে কিনা এবং বিদ্যমান সেবা কার্যক্রম আরও কীভাবে সহজ ও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান।

বৈঠকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী। তিনি জানান, দেশটিতে বর্তমানে আনুমানিক ৮ থেকে ১৫ লাখ অভিবাসী রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈঠকে মালয়েশিয়ার কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। 

হাইকমিশনার জানান, মালয়েশিয়ায় মোট ৩৭টি কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের আটক রাখা হয়। পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের জন্য রয়েছে ১৭টি ডিটেনশন ক্যাম্প। এসব কারাগার ও ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রায় ১ হাজার ৯০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন বলে বৈঠকে জানানো হয়। তাদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বন্দি বাংলাদেশিদের আইনগত সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিষয়েও আলোচনা হয়। হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাইকমিশন কাজ করছে বলেও তিনি বৈঠকে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য (ফ্রি ট্রেড) নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। হাইকমিশনারের উদ্যোগে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি বা সমঝোতা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। বৈঠকে এটিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। 

বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রসঙ্গে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। হাইকমিশনার বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় না এসে অনেক সময় রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি-সংক্রান্ত বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিষয়টি দুঃখজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির শ্রমবাজারে সুযোগ রয়েছে।

হাইকমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় প্রায় ২ হাজার ৫০০টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি রয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও হয়রানিমুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের পরিস্থিতি ও তাদের আত্মসম্মান নিয়ে জানতে চান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

জবাবে হাইকমিশনার জানান, বর্তমানে বাংলাদেশি নারীদের জন্য মালয়েশিয়ায় দক্ষ ও অদক্ষ উভয় ধরনের কর্মসংস্থানের ভিসা সীমিত বা অনুপস্থিত রয়েছে। এ সময় নারী কর্মীদের জন্য ভবিষ্যতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় নেওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে, যার বর্তমান মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এই সমঝোতার আওতায় ভবিষ্যতে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা করেন বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। বৈঠকে প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় হাইকমিশনের ভূমিকা আরও জোরদারের আহ্বান জানান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, আপনারা এখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। সুতরাং এখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের মানুষের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আপনাদের। আপনাদের যে কোনো সহযোগিতা লাগলে আমরা করতে প্রস্তুত। মালয়েশিয়া-সংক্রান্ত সঠিক ও নির্ভুল তথ্য বাংলাদেশ সরকার এবং বিরোধী দলকে সরবরাহের জন্যও তিনি হাইকমিশনের প্রতি আহ্বান জানান। 

একই সঙ্গে শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় আসার প্রক্রিয়ায় দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো, অর্থ লেনদেনের অনিয়ম ও হয়রানি বন্ধ এবং প্রবাসীদের জন্য আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে হাইকমিশনকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠকে হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী, ডেপুটি হাইকমিশনার মোসাম্মাদ শাহানারা মনিকা, মিনিষ্টার লেবার সিদ্দিকুর রহমান এবং হেড অব চ্যান্সারি প্রণব কুমার ভট্টাচার্য উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর মালয়েশিয়া শাখার সেক্রেটারি জেনারেল ড. খাইরুল ইসলাম, ড. ইউসুফ আলী ও সাইফুদ্দিন ইয়াহহিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

 

 

আয়শা/০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:৩৪

▎সর্বশেষ

ad