জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে কথিত সালিশি বৈঠকের পর মারধরের ঘটনায় ফিরোজ ইসলাম (২৪) নামের এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ও ধোয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের স্বজনরা প্রথমে তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ এনে মহাসড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন করলেও থানায় দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, মারধর ও অপমান সহ্য করতে না পেরে তিনি বিষপান করেন। একই ঘটনায় পরিবারের দুই ধরনের বক্তব্য এবং মামলার ধরন নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নিহত ফিরোজ ইসলাম পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রসুলগঞ্জ (বানিয়াপাড়া) এলাকার মৃত দিনার উদ্দিন দিনুর ছেলে। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১ আগস্ট দুপুরে জমির গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে ফিরোজের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশীদের বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরও বিরোধের জের ধরে বিকেলে কয়েকজন অভিযুক্ত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ফিরোজের বাড়িতে প্রবেশ করে তাকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে তিনি গুরুতর আঘাত পান।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, মারধর ও অপমানের গ্লানি সইতে না পেরে ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে ফিরোজ নিজ ঘরে গিয়ে বিষপান করেন। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২ আগস্ট সকালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় নিহতের মরদেহ এলাকায় পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী পাটগ্রামের ঢাকা-বুড়িমারী মহাসড়কের আন্তঃজেলা মোড়ে মরদেহ রেখে সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন করেন। এ সময় মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীরা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার, হত্যা মামলা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পরে পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশ্বাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
মানববন্ধনে নিহতের বড় ভাই মো. ফেরদৌস ইসলাম অভিযোগ করেন, পাটগ্রাম পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাফিউল ইসলাম (সামলু), ছাত্রদল নেতা স্বাধীন, স্থানীয় সাবেক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহীন সাই ও তার ছেলে তুহীনসহ কয়েকজন সালিশি বৈঠকের নেতৃত্ব দেন। সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় তারা প্রথমে ফিরোজকে মারধর করেন এবং পরে বাড়িতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালান। ওই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে মানববন্ধনে নিহতের পরিবার সরাসরি পিটিয়ে হত্যার দাবি জানালেও, থানায় দায়ের করা লিখিত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, মারধর ও অপমানের পর ফিরোজ বিষপান করেন। সেই এজাহারের ভিত্তিতে পাটগ্রাম থানায় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৪, ৩০৭, ৩০৬, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। পরিবারের এমন দ্বিমুখী অবস্থানে স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে নিহতের বড় ভাই মো. ফেরদৌস ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমি সরাসরি হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ সেই মামলা নেয়নি। পরে এজাহারে বিষপানের বিষয়টি উল্লেখ করার পর পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করে। আমি আমার ভাইয়ের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চাই। মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তরা আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘটনার বিষয়ে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, সোমবার রাতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত এজাহার পাওয়া গেছে। সেই এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। এটি হত্যা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো অপরাধের ফল, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত সাপেক্ষে নিশ্চিত হয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আয়শা/০৪ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৩:৩২
