আন্তর্জাতিক ডেস্ক :জাপানের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের তোলা ‘নব্য সামরিকবাদ’ বা ‘নিউ মিলিটারিজম’-এর অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি। উল্টো চীনের ব্যাপক সামরিক সম্প্রসারণ এবং তথ্যের অস্বচ্ছতার তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।
সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এশিয়ার শীর্ষ নিরাপত্তা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’-এর সমাপনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে কোইজুমি যুক্তি দেন, প্রকৃতপক্ষে চীন এবং তাদের হাতে থাকা ‘বিশাল অস্ত্রাগার’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন গভীর উদ্বেগের কারণ। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অধীনে দেশটির সাম্প্রতিক সামরিক বাজেট বৃদ্ধির পর বেইজিংয়ের লাগাতার সমালোচনার জবাবে টোকিওর পক্ষ থেকে এটিকে এযাবৎকালের সবচেয়ে কড়া প্রত্যুত্তর বলে মনে করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের চীন আক্রমণের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র উত্তেজনা রয়েছে। এই সম্মেলনের মাত্র একদিন আগে চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জিয়াং বিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, জাপানের নব্য সামরিকবাদের ‘ধূসর গণ্ডার’ (আসন্ন বড় বিপদ) অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে, যা রুখতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের একযোগে কাজ করা উচিত। এর জবাবে সিঙ্গাপুরে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাপানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, যে দেশের কাছে পরমাণু অস্ত্র এবং কৌশলগত বোমারু বিমানের বিশাল ভান্ডার রয়েছে, তারা যখন এই ধরনের কোনো অস্ত্র না থাকা জাপানকে ‘সামরিকবাদী’ বলে আখ্যা দেয়, তখন তা সত্যিই অদ্ভুত শোনায়।
কোইজুমি স্পষ্ট করে বলেন, নিজের আত্মরক্ষা এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করা যেকোনো দেশের জন্যই অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আগ্রাসনের শিকার হওয়া এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোকে আশ্বস্ত করে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, জাপান অত্যন্ত স্বচ্ছতা বজায় রেখে এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তার প্রতিরক্ষা খাতের উন্নয়ন ঘটাবে।
বক্তব্য শেষে চীনা সামরিক বাহিনীর এক প্রতিনিধি যখন জানতে চান যে জাপান পূর্ব এশিয়ার ভুক্তভোগী দেশগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করবে কি না, তখন কোইজুমি সরাসরি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে চীনের দিকেই তোপ দাগেন। তিনি বলেন, চীন পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছাড়াই যেভাবে তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, তা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনার দরজা টোকিও সব সময় খোলা রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। জাপানের সর্বশেষ অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ী প্রতিরক্ষা খাতে রেকর্ড ৯ লাখ কোটি ইয়েন (প্রায় ৫৭ বিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করা হয়েছে, যা দেশটির মোট জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি। এই নতুন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাপান দূরপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এমনকি অন্য দেশে প্রাণঘাতী অস্ত্র রফতানির নিয়মও শিথিল করেছে দেশটি। টোকিওর এই নতুন সামরিক নীতি এবং জাপানের যুদ্ধবিরোধী শান্তিবাদী সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৯’ সংশোধনের বিষয়ে তাকাইচির তোড়জোড় খোদ জাপানের ভেতরেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গত নভেম্বরে তাকাইচি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে চীন যদি তাইওয়ানে হামলা চালায় তবে জাপান তার আত্মরক্ষা বাহিনীকে সেখানে নিয়োজিত করতে পারে, যার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায়। জাপানের একটি বড় অংশ দেশের সুরক্ষায় এই সামরিক প্রস্তুতিকে সমর্থন করলেও, প্রবীণ ও যুদ্ধবিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের পথ তৈরি করতে পারে। এই নীতি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি জাপানের ইতিহাসে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
কিউটিভি/অনিমা/৩১.০৫.২০২৬/বিকাল ৪.৫০
