একটি কালের সমাপ্তি: রাইট টু ফ্রিডম হয়ে ওঠে একটি সাহসী কন্ঠের বিশ্বমঞ্চ

khurshed | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১১:৩৯:৩৪ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভোরে ঘুম থেকে জেগেই আমি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি. মাইলামের মৃত্যুসংবাদ পাই। গত কয়েক মাস ধরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল, তাই খবরটি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবুও এই দুঃসংবাদ আমাকে এবং বিশ্বজুড়ে তার অসংখ্য বন্ধু, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের গভীরভাবে শোকাহত করেছে। প্রায় নব্বই বছরের দীর্ঘ জীবনে তিনি যেমন একজন কূটনীতিক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন, তেমনি গবেষক ও চিন্তাবিদ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

তার দীর্ঘ কর্মজীবনের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা সহজ নয়। বরং আমি তার জীবনের শেষ কয়েক বছর এবং বাংলাদেশকে ঘিরে তার নিরলস প্রচেষ্টার কথা বলতে চাই। তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছিলেন, দেশটি কীভাবে স্বৈরাচারী শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল, তা যাতে নষ্ট না হয়—সে বিষয়ে তিনি ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

গত কয়েক বছর আগে তিনি একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন গড়ে তোলেন। রাইট টু ফ্রিডম নামের সংগঠনটির লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলা। তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী বর্তমানে মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারীর সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতেন। এই উদ্যোগ ছিল ছোট, কিন্তু এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যারা নিজ দেশে ভয়ে বা বাধার কারণে কথা বলতে পারতেন না, তাদের জন্য এটি হয়ে উঠেছিল একটি সাহসী কণ্ঠের মঞ্চ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার স্পষ্ট সমালোচনা তৎকালীন সরকারের অসন্তোষের কারণ হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও তোলা হয়। কিন্তু এসব কিছুই তাকে বিচলিত করতে পারেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য উচ্চারণ করা নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে শুরু করে জনসম্মুখে বক্তব্য—সব ক্ষেত্রেই তিনি তার মতামত অকপটে প্রকাশ করতেন।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। তিনি এটিকে দেখেছিলেন মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম হিসেবে। আশির দশকের শেষদিকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি এক স্বৈরশাসনের সময়কাল প্রত্যক্ষ করেছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও তিনি দেখেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ কতটা জটিল  হতে পারে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে তিনি বহু বছর পর বাংলাদেশ সফরে আসেন। শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মসূচি পালন করেন। দেশটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার আগ্রহ এতটাই গভীর ছিল যে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও তিনি খুব একটা দেননি নিজেকে।

সফর শেষে দেশে ফিরে তার শারীরিক জটিলতা বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে সংগঠনের (রাইট টু ফ্রিডম) নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। তবে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।

তার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর যে শোক ও শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে, তা প্রমাণ করে তিনি কতো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। কেউ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, কেউ বা শুধু তার লেখা পড়ে তাকে চিনেছেন—সবাই আজ তাকে স্মরণ করছেন গভীর শ্রদ্ধায়।

বাংলাদেশের প্রতি আন্তরিক মমত্ববোধ ছিল তার জীবনের এক বিশেষ দিক। আমরা একজন অকৃত্রিম বন্ধু, উপদেষ্টা ও ন্যায়সংগত কণ্ঠস্বর হারালাম। তার প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে আমাদের উচিত তার আদর্শ ও কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

 

 

আয়শা/২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ১১:২০

▎সর্বশেষ

ad