
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এক ফাঁস হওয়া ভিডিওতে দাবি করেছেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার সময় মার্কিন বাহিনী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের মাত্র ১৫ মিনিট সময় দিয়েছিল। ওই সময়ের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছিল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে হবে, নতুবা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
মার্কিন হামলার সাত দিন পর ভেনেজুয়েলায় অনুষ্ঠিত দুই ঘণ্টার একটি গোপন বৈঠকের এই ভিডিও সংগ্রহ করেছে দেশটির সাংবাদিক সংগঠন ‘লা হোরা দে ভেনেজুয়েলা’। ভিডিওতে দেখা যায়, মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং ভেতরের আতঙ্কের কথা তুলে ধরছেন রদ্রিগেজ।
শুরু থেকেই ছিল হত্যার হুমকি
ভিডিওতে রদ্রিগেজ বলেন, প্রেসিডেন্টকে আটক করার প্রথম মিনিট থেকেই হুমকি দেওয়া শুরু হয়। তাকে, তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়োকে জানানো হয়—১৫ মিনিটের মধ্যে সিদ্ধান্ত না নিলে তাদের হত্যা করা হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী শুরুতে তাদের জানিয়েছিল যে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ নয়, হত্যা করা হয়েছে। সে সময় তারা সবাই একই পরিণতি বরণ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন বলেও জানান রদ্রিগেজ।
ক্ষমতা ধরে রাখাই ছিল প্রধান লক্ষ্য
ফাঁস হওয়া ওই রেকর্ডিংয়ে রদ্রিগেজ স্বীকার করেন, এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা। তিনি বলেন, এই দায়িত্ব নেওয়া ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, তবে কৌশলগত বিচক্ষণতা ও ধৈর্যের মাধ্যমেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে।
তিনি তিনটি মূল লক্ষ্য উল্লেখ করেন—দেশে শান্তি বজায় রাখা, জিম্মিদের উদ্ধার করা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা সংরক্ষণ করা।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করা কোনো স্বেচ্ছামূলক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল থেকে বাঁচার একটি কৌশল।
সরকারের ভেতরে আতঙ্ক
ভিডিওতে দেখা যায়, সরকারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও গভীর আতঙ্ক ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কারণে তারা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকেই।
খবরে বলা হয়েছে, মাদুরো গ্রেফতার হওয়ার আগেই রদ্রিগেজ ও তার ভাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের প্রশংসা, সঙ্গে হুঁশিয়ারি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে দেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল খনিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবেশের সুযোগ দিলে আমেরিকা আরও ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রদ্রিগেজ যদি সঠিক পথে না চলেন, তাহলে তাকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের সন্দেহ
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদ মার্গারিটা লোপেজ মায়া এই ঘটনাকে রদ্রিগেজের সাজানো একটি বয়ান বলে মনে করেন। তার মতে, ভেনেজুয়েলার ভেতরের শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠীর সহযোগিতা ছাড়া শুধুমাত্র মার্কিন বাহিনীর পক্ষে মাদুরোকে অপসারণ করা সম্ভব ছিল না।
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, রদ্রিগেজ এখন নিজেকে নির্দোষ ও দেশপ্রেমিক হিসেবে তুলে ধরতেই এই ভিডিওর নাটকীয় তথ্য সামনে আনছেন।
মাদুরো গ্রেফতার হওয়ার পর ভেনেজুয়েলা সরকার প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেও বাস্তবে প্রায় সব মার্কিন শর্ত মেনে চলছে। ফলে দেশটির শাসনব্যবস্থা এখন অনেকটাই মার্কিন নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
একদিকে ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা, অন্যদিকে রদ্রিগেজের হত্যার হুমকির অভিযোগ—এই দুইয়ের মাঝেই ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তায়। বিশ্বমঞ্চে অনেকেই এই ঘটনাকে মার্কিন একতরফা আধিপত্যের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আয়শা/২৫ জানুয়ারী ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:১৪






