
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিভিন্ন দেশ থেকে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে মোট এক লাখ ১৫ হাজার ৪৪০ জন অভিবাসীকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ছেড়ে যাওয়ার আইনি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে অনিয়মিত অবস্থানের কারণে এই এক লাখ ১৫ হাজার ৪৪০ জনের বিরুদ্ধে দেশ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয়তা অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আদেশ পেয়েছেন আলজেরিয়ার নাগরিকরা। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে ১২ হাজার ৩২৫ জন আলজেরীয় নাগরিককে ইউরোপের যে দেশে তারা আছেন সেই দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যা মোট আদেশের প্রায় ১০ শতাংশ।
এরপর রয়েছেন মরক্কোর (৬ হাজার ৬৭০ জন) এবং তুরস্কের নাগরিকরা (৬ হাজার ৩৫০ জন)। দেশভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশ ছাড়ার আদেশ বা ওকিউটিএফ জারি করেছে ফ্রান্স।
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে দেশটি ৩৩ হাজার ৭৬০ জনের বিরুদ্ধে এই আদেশ দিয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জার্মানি, যেখানে ১২ হাজার ৫০০টি আদেশ জারি করা হয়েছে। এরপর গ্রিসে এই সংখ্যা ১০ হাজার ১০০ জন। ইউরোস্ট্যাট বলছে, এই তিনটি দেশ মিলেই ইইউতে জারি করা মোট দেশ ছাড়ার আদেশের প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে।
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে যাদের বিরুদ্ধে দেশ ছাড়ার আদেশ জারি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ৩৪ হাজার অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ১৪ শতাংশ বেশি। তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ৫১০ জনকে পুলিশি প্রহরায় জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে। অন্যরা ‘স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ ছেড়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মোট প্রত্যাবর্তনের প্রায় ৬০ শতাংশ স্বেচ্ছায় এবং ৪০ শতাংশ জোরপূর্বক হয়ে থাকে।
প্রত্যাবাসন কার্যকর করার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে জার্মানি। ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে দেশটি থেকে সাত হাজার ১৯০ জন অনিয়মিত অভিবাসী নিজ দেশে ফিরে গেছেন। একই সময়ে ফ্রান্স থেকে ফিরেছেন তিন হাজার ৭৬০ জন এবং সাইপ্রাস থেকে তিন হাজার জন। তবে এই সংখ্যার মধ্যে স্বেচ্ছা ও জোরপূর্বক-দুই ধরনের প্রত্যাবর্তনই অন্তর্ভুক্ত। শুধু জোরপূর্বক বহিষ্কারের হিসাব করলে দেখা যায়, এখানেও জার্মানি শীর্ষে রয়েছে। দেশটি তিন হাজার ৭১০ জনকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠিয়েছে।
এরপর ফ্রান্স থেকে এক হাজার ৪৩৫ জন এবং ইতালি থেকে এক হাজার ১০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের হার সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। দেশটিতে ফেরত পাঠানোর সবই জোরপূর্বক এবং কোনো স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন হয়নি।দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক, যেখানে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের হার ৯১ শতাংশ। ফ্রান্সে এই হার তুলনামূলক কম অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ জোরপূর্বক এবং ৬১ শতাংশ স্বেচ্ছায় ফিরে গিয়েছেন। ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আলজেরীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রত্যাবাসনের হার খুবই কম।
২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে পুরো ইইউজুড়ে মাত্র ৩৫০ জন আলজেরীয় নাগরিককে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, আলজেরিয়া খুব কম ক্ষেত্রেই কনস্যুলার পাস ইস্যু করে। কনস্যুলার পাস পাসপোর্টবিহীন অভিবাসীদের বহিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় একটি নথি। ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, আলজেরিয়া এই ধরনের কনস্যুলার নথি দিতে দেরি করে বা অনেক সময় প্রত্যাখ্যান করে। ফ্রান্সে বিদেশে বসবাসরত সবচেয়ে বড় আলজেরীয় কমিউনিটি রয়েছে। যাদের একটি অংশ অনিয়মিত অবস্থায় বসবাস করেন।
এ ছাড়া আলজেরিয়ার আইন অনুযায়ী, যারা অবৈধভাবে দেশ ত্যাগ করেছেন, তাদের শাস্তির বিধান থাকায় অনেক আলজেরীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতেও আগ্রহী নন। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। গত ১১ জানুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুন ঘোষণা দিয়েছেন, বিদেশে অবস্থানরত ‘অনিয়মিত ও অনিশ্চিত’ অবস্থায় থাকা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত নন এমন অভিবাসীদের দায়মুক্তি প্রদানের লক্ষ্যে একটি ডিক্রি জারি করা হবে।
তবে বোর্দো-মোঁতান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও আলজেরিয়া বিশেষজ্ঞ কিন্দা বেন ইয়াহিয়া বলেন, এই ঘোষণার বাস্তব প্রভাব নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তার ভাষায়, ডিক্রিটির সুনির্দিষ্ট শর্ত, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং বিদ্যমান আইনের সঙ্গে এর সমন্বয় এখনো স্পষ্ট নয়। এই উদ্যোগের ফলে আলজেরীয় তরুণদের ‘ব্যাপক প্রত্যাবাসন’ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইউরোস্ট্যাট বলছে, তথ্যের সঙ্গে ফ্রান্সের প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রগুলোর (সিআরএ) মিল রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, সিআরএতে দেশ ছাড়ার আদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে আলজেরীয় নাগরিকরাই সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে আছেন। ২০২৪ সালে মানবাধিকার সংগঠন লা সিমাদে বলেছিল, ওই বছর ফ্রান্সের আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা অভিবাসীদের বড় অংশই ছিলেন মাগরেব অঞ্চলের নাগরিক। তাদের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি ছিলেন আলজেরীয়, এক হাজার ৯০০ জন তিউনিশীয় এবং এক হাজার ৭০০ জন মরক্কোর নাগরিক।
অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি। একই সময়ে প্রায় ৭০০ জন রোমানীয়, ৪৫০ জন আলবেনীয়, ৩৫০ জন গিনির নাগরিক, ৩০০ জন আফগান এবং ৩০০ জন আইভোরি কোস্টের নাগরিক এসব কেন্দ্রে আটক ছিলেন। ইনফোমাইগ্রেন্টস।
আয়শা/২৫ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:২০






