স্পোর্টস ডেস্ক : চা-বাগানের সবুজ, টিলা পাহাড়ের হাতছানি আর মেঘের আনাগোনায় সিলেটের প্রকৃতি বরাবরই মুগ্ধতা ছড়ায়। ঢাকার ব্যস্ততা পেরিয়ে এমন মনোরম পরিবেশে এলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অনুপ্রাণিত হওয়ারই কথা। সিলেটের সৌন্দর্য যেন তাদের জন্য বাড়তি প্রেরণা। অবশ্য এই শহর বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্যও সৌভাগ্যের। এখানকার মাঠে অতীতে দারুণ কিছু স্মৃতি আছে স্বাগতিকদের। সেই সুখস্মৃতিই এবার নতুন করে আত্মবিশ্বাস জোগানোর কথা।
তবে প্রকৃতির স্নিগ্ধতার বিপরীতে বাংলাদেশ দলের ভেতরে এখন বেশ অস্বস্তি। অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর থেকে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিততে পারেনি তারা। টানা সাত ম্যাচে জয়হীন বাংলাদেশ। এর মধ্যে জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানের বিপক্ষেও হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে সিলেটে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় স্বাগতিকরা।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের অপেক্ষা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের জন্য। বাস থেকে নামতেই রবি রামপল ও ফ্লয়েড রেইফারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়। প্রতিপক্ষ দলের কোচ হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ তার নিজের দেশ। পেশাদারিত্বের প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই, সেটি আগেই স্পষ্ট করেছেন সিমন্স। তবু পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে হাসি-ঠাট্টায় জমে উঠল কিছুক্ষণ। রবি রামপল তো মজা করে বলেই ফেললেন, ‘প্রতিপক্ষের কোচ, আপনাদের অবস্থা কেমন?’ সিমন্সের মুখেও তখন হাসি।
মাঠের লড়াইয়ে হাসির অবকাশ কম। ডারউইনের সেই জয়ের পর কেন বাংলাদেশ ছন্দ হারিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন বলেই মনে করেন সিমন্স। কোচের ভাষায়, ‘ডারউইনের পর থেকে আমরা জিততে পারিনি। বিশেষ করে ব্যাটিং ভালো হয়নি। ডারউইনে আমরা নিজেদের সামর্থ্য, দৃঢ়তা ও ইতিবাচক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলাম। এরপর যে সংস্করণগুলোতে খেলেছি, সেগুলোতে ব্যাটিং ভালো হয়নি। উইকেট দেখে ভালো মনে হচ্ছে। গত বছর কিংবা এ বছরের শুরুতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এখানে যে উইকেটে খেলেছিলাম, সেটির মতোই মনে হচ্ছে। ভালো ক্রিকেট উইকেট হবে বলে আশা করছি।’
বড় জয় কিংবা সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশের ছন্দ হারানোর প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিমন্স অবশ্য অনুশীলনের ঘাটতি দেখছেন না। তার মতে, পরিশ্রমে কোনো কমতি নেই, সমস্যা হচ্ছে মাঠে তার প্রতিফলন ঘটাতে না পারা। তিনি বলেন, ‘ডারউইন কিংবা পাকিস্তান সফরের আগে আমরা যেভাবে এবং যে তীব্রতা নিয়ে অনুশীলন করেছি, ছেলেরা এখনো একইভাবে কঠোর পরিশ্রম করছে। কিন্তু ম্যাচে সেটা কাজে লাগাতে পারছে না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আবারও যেন সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারি, যেখানে অনুশীলনে করা কাজগুলো ম্যাচেও বাস্তবায়ন করতে পারব।’
ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিং নিয়েও দুশ্চিন্তা রয়েছে। সর্বশেষ টেস্টে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যাচ ফেলে তার মাশুল দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। অনুশীলনেও ক্যাচ মিসের ঘটনা চোখে পড়ছে। সিমন্স অবশ্য একটি ম্যাচের ব্যর্থতা দিয়ে পুরো দলের ফিল্ডিং বিচার করতে রাজি নন।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। ম্যাচে ক্যাচ পড়তেই পারে। আমাদের চেয়েও ভালো ফিল্ডিং করা দলকে এক ম্যাচে অনেক ক্যাচ ফেলতে দেখেছি। তার মানে এই নয় যে তারা খারাপ ফিল্ডিং দল। আমরাও নিয়মিত ক্যাচ নিচ্ছি। ওই ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ফিল্ডিং করতে পারিনি। এই পর্যায়ের ক্রিকেটে এত ক্যাচ ছাড়া উচিত হয়নি।’
দলের আরেক বড় চিন্তার নাম তাইজুল ইসলাম। সর্বশেষ চার ম্যাচে বাঁহাতি স্পিনারের শিকার মাত্র পাঁচ উইকেট। সঙ্গে কাঁধের চোট নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অথচ সিলেটের মাঠের সঙ্গে তাইজুলের সখ্য পুরোনো। এই মাঠেই সর্বশেষ ম্যাচে নয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে জিতিয়েছিলেন তিনি। তাইজুলের সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়ে সিমন্সও উদ্বিগ্ন।
তার কথায়, ‘অবশ্যই উদ্বেগের। সে আমাদের দলের অন্যতম প্রধান স্পিনার। বিষয়টি তার নিজের জন্যও উদ্বেগের। তার সঙ্গে কথা বললেও বোঝা যায়, বিষয়টি নিয়ে সে চিন্তিত। সে আমাদের দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।’
তবে চোট নিয়ে খুব বেশি শঙ্কা দেখছেন না কোচ। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে চিকিৎসকদের জিজ্ঞেস করতে হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার কিছুটা সমস্যা হয়েছিল, সেটা জানি। তবে এরপর থেকে সে ভালোভাবেই থ্রো করছে, পুরো শক্তিতে বোলিং করছে। গতকালও পূর্ণ গতিতে অনুশীলন করেছে। তাই মনে হচ্ছে না, সমস্যাটি তার বোলিংয়ে প্রভাব ফেলছে।’
লিটন দাসেরও চোটের সমস্যা রয়েছে। তবে মুশফিকুর রহিম পুরোপুরি ফিট। মুমিনুল হক না থাকায় মুশফিককে তিন নম্বরে ব্যাট করতে হতে পারে। সব মিলিয়ে সিলেটের সবুজ-স্নিগ্ধ পরিবেশে স্বস্তির খোঁজে বাংলাদেশ। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের থাকলেও স্বাগতিকদের সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ—জয়ের পথে ফেরা।
আয়শা/০৪ নভেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:০৮
