আন্তর্জাতিক ডেস্ক : স্পেনের দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। চলতি শতাব্দীতে ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি এটি।
বুধবার মধ্য স্পেনের কাস্তিয়া-লা মানচা অঞ্চলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। চলতি বছর স্পেনে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল।
কাস্তিয়া-লা মানচার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাখে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রায় ৬৮ জনের মৃত্যুর কথা বলছি। তবে এই সংখ্যা সম্ভবত আরও বাড়বে।’ এর আগে নিহতের সংখ্যা ৩১ বলে জানানো হয়েছিল। সরকারিসেবা
কাস্তিয়া-লা মানচা সরকারের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৮ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এদের ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে যখন হেলিকপ্টার দুর্ঘটনাস্থলের ওপর চক্কর দিচ্ছিল, তখন একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেবাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকটি কালো রঙের ভ্যান ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফে এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের একটি ট্রেন স্পেনের বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিওর একটি ট্রেনের সঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়ার পর মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণ স্পেনগামী প্রধান দ্রুতগতির রেলপথে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরিও জানায়, তাদের ট্রেনটিতে চালকসহ ১৪৭ জন যাত্রী ও পাঁচজন কর্মী ছিলেন। রেনফের ট্রেনটি পেছন থেকে তাদের ট্রেনকে ধাক্কা দেয়।
মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮০ মাইল) দক্ষিণে উর্দা গ্রামের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী ম্যানুয়েল অর্তিজকে দুর্ঘটনাস্থলে দৃশ্যত বিচলিত অবস্থায় দেখা যায়। তিনি এএফপিকে বলেন, সকাল থেকে নিজের গাড়িতে করে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবহন করছেন।
অর্তিজ বলেন, ইরিওর ট্রেনের যাত্রীরা তাকে জানিয়েছেন, সংঘর্ষের সময় তাঁদের ট্রেনটি দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ, ভীষণ ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, সেখানে ‘দুর্ঘটনার, ধাতব পদার্থের গন্ধ’ ছিল।
রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের আগাম সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার এক মাস আগে এ দুর্ঘটনা ঘটল। আগামী ২৯ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিকূল জনমত জরিপের ফল উল্টে দিয়ে আট বছরের প্রধানমন্ত্রিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি। এ বছরের প্রথম রেল দুর্ঘটনার পরও ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সানচেজ। সরকারিআদেশ দেখুন
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সানচেজ দুর্ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার খবরে তিনি ‘মর্মাহত’। নিহত ও আহতদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি ‘ভালোবাসা, সংহতি ও সমর্থন’ জানান তিনি।
স্পেন ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে শোকবার্তা এসেছে। স্পেনের রাজপরিবার এক্সে দেওয়া বার্তায় দুর্ঘটনায় ‘মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন’ বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে হতাহতদের পরিবার এবং উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জরুরি সেবাকর্মীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তারা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রয়োজন হলে স্পেনকে সহায়তা দিতে জোটটি প্রস্তুত রয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডার লেইন দুর্ঘটনাটিকে ‘বিধ্বংসী খবর’ উল্লেখ করে বলেন, ‘ইউরোপ হতাহতদের সঙ্গে শোক প্রকাশ করছে।’ সংবাদপড়ুন
দুর্ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি জানিয়ে স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন কোপা দেল রের প্রথম পর্বের ২৪টি ম্যাচ স্থগিত করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর ফলে চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে দেশটির রেলব্যবস্থা, যা স্পেনের জাতীয় গর্বেরও একটি উৎস।
তবে বুধবারের দুর্ঘটনার আগে গত জানুয়ারিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় আদামুজ গ্রামের কাছে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনা দেশটির রেল নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে।
জানুয়ারির ওই দুর্ঘটনাটি ছিল ২০১৩ সালের পর স্পেনে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা। সে বছর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলা শহরের বাইরে রেললাইনের বাঁক অতিক্রম করার সময় একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হলে ৮০ জন নিহত হন।
চলতি বছরের দুটি দুর্ঘটনাই মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় সেভিয়া শহরের সংযোগকারী রেলপথে ঘটেছে।
সর্বশেষ দুর্ঘটনার কারণ এখনো জানা যায়নি। রেললাইনটির একটি সোজা অংশে রৌদ্রোজ্জ্বল ও শুষ্ক আবহাওয়ায় সংঘর্ষটি ঘটে। এএফপির সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে সাদা পোশাক পরা পাঁচজনকে রেললাইন পরীক্ষা করতে ও ছবি তুলতে দেখেছেন।
স্পেনের অন্যতম ব্যস্ত রেলপথ এটি। ১৯৯২ সালে সেভিয়া আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালু হওয়া এ রেললাইনটি ছিল দেশটির প্রথম দ্রুতগতির রেলপথ।
কিউটিভি/অনিমা/২৯ অক্টোবর ২০২৬,/সকাল ১১:০৮
