স্পোর্টস ডেস্ক : আর বাকি মাত্র কয়েক প্রহর। আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি অধ্যায়ের সমাপ্তি হতে যাচ্ছে এক বর্ণাঢ্য গল্পের মধ্য দিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২০৭ ম্যাচে ১০৫ গোল—এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
২০০৫: অভিষেকেই লাল কার্ড
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শুরুটা হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ভিলমোস ভানচাকের সঙ্গে সংঘর্ষের পর রেফারি মার্কুস মের্ক তাকে লাল কার্ড দেখান। মাঠ ছাড়ার সময় চোখে পানি ছিল তরুণ মেসির।
২০০৬: দুর্দান্ত শুরু, শেষটা হতাশার
সার্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপে অভিষেকেই নজর কাড়েন মেসি। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৬-০ গোলে। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় দল। অতিরিক্ত সময়ে মেসিকে মাঠে না নামানোর সিদ্ধান্তের কারণে কোচ হোসে পেকেরমানকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
২০০৭: প্রথম ফাইনালেই পরাজয়
ভেনেজুয়েলায় কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলে হারে আর্জেন্টিনা। এটি ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ফাইনাল। রিকেলমেসহ অভিজ্ঞদের ছায়ায় থাকা মেসিকেও এরপর থেকে জাতীয় দলের হয়ে পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।
২০১০: ম্যারাডোনার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
দিয়েগো ম্যারাডোনা মেসির ওপর আস্থা রেখে তাকে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে সেই আস্থা পুরোপুরি ফেরাতে পারেননি মেসি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় আর্জেন্টিনা। পুরো টুর্নামেন্টে গোল না পাওয়ায় মেসিকে ঘিরে সমালোচনা আরও তীব্র হয়।
২০১১: সমালোচনার তীব্রতা বাড়ে
ঘরের মাঠে কোপা আমেরিকাতেও ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় তারা। এরপর মেসির জাতীয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে আরও প্রশ্ন ওঠে। এমনকি তাকে এমন খেলোয়াড় হিসেবেও কটাক্ষ করা হয়, যিনি ক্লাবের মতো জাতীয় দলের হয়েও নিজের সেরা খেলাটা দিতে পারেন না।
২০১৪: বিশ্বকাপের খুব কাছে গিয়েও শিরোপা হারানো
ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দারুণভাবে এগিয়ে যায় ফাইনাল পর্যন্ত। কিন্তু শেষ ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। ম্যারাডোনার পাশে নিজের নাম লেখানোর বড় সুযোগ হাতছাড়া করেন মেসি।
২০১৫: চিলির কাছে আরেক ফাইনাল হার
কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। আরও একটি ফাইনাল পরাজয় যোগ হয় মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে। নেতৃত্ব ও শিরোপা জেতার ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনাও বাড়তে থাকে।
২০১৬: অবসরের ঘোষণা
কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিওর ফাইনালেও প্রতিপক্ষ ছিল চিলি। ম্যাচের পর টাইব্রেকারে আবারও হারে আর্জেন্টিনা। শুটআউটে নিজের পেনাল্টি মিস করার পর ভেঙে পড়েন মেসি। এরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
২০১৮: প্রত্যাবর্তন, কিন্তু শিরোপা অধরা
অবসরের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আবার জাতীয় দলে ফেরেন মেসি। তবে রাশিয়া বিশ্বকাপেও অপেক্ষার অবসান হয়নি। শেষ ষোলোতে ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির শিরোপা জয়ের প্রশ্নটি তখনও অমীমাংসিত।
২০১৯: ব্রাজিলের কাছে আবারও থেমে যাওয়া
কোপা আমেরিকায় মেসির ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান ছিল এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট। সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলের কাছে হেরে আবারও শিরোপা থেকে দূরে সরে যায় আর্জেন্টিনা। তখন পর্যন্ত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে হতাশার অধ্যায়ই যেন বেশি দীর্ঘ ছিল।
২০২১: বদলে গেল মেসির গল্প
এরপরই আসে বড় পরিবর্তন। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে নতুনভাবে গড়ে ওঠা আর্জেন্টিনা দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মেসি। মারাকানায় কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। মেসিও পান তার প্রথম মেজর আন্তর্জাতিক ট্রফি।
এরপর ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জেতে আর্জেন্টিনা। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্প তখন ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের দিকে মোড় নেয়।
২০২২: পূরণ হলো বিশ্বকাপের স্বপ্ন
কাতার বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের মাধ্যমে অবশেষে পূর্ণতা পায় তার বিশ্বকাপের স্বপ্ন।
যে মেসিকে একসময় জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থতার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল, বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই মেসিই আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান।
২০২৪: আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা
বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেনি আর্জেন্টিনার সাফল্য। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে আরও একটি শিরোপা ঘরে তোলে আলবিসেলেস্তে। মেসির নেতৃত্বে দলটি তখন পরিণত হয় বিশ্বের অন্যতম সফল জাতীয় দলে।
২০২৬: শেষ অধ্যায়েও অনন্য মেসি
৩৯ বছর বয়সে এসে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নেন মেসি। আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যান স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফিটি হয়ত তুলে ধরা হয়নি, তবে বয়সের ভারকে পেছনে ফেলে এত দীর্ঘ সময় সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া তার অসাধারণ স্থায়িত্বেরই প্রমাণ।
পরবর্তীতে কিলিয়ান এমবাপ্পে তার বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও মেসির গল্প ম্লান হওয়ার নয়। কারণ তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আসল গল্প শুধু গোল বা পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। লাল কার্ড দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা পেরিয়েছে অসংখ্য পরাজয়, সমালোচনা, অবসর ঘোষণা ও প্রত্যাবর্তনের অধ্যায়।
শেষ পর্যন্ত শিরোপা জয়, বিশ্বকাপের গৌরব এবং আর্জেন্টিনার মানুষের ভালোবাসায় পূর্ণ হয়েছে সেই গল্প। ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার এই দীর্ঘ পথই মেসিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের চিরস্মরণীয় কিংবদন্তিদের একজন করে তুলেছে।
আয়শা/০৬ অক্টোবর ২০২৬,/রাত ৮:৩৩
