আন্তর্জাতিক ডেস্ক : উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর প্রাচীন শহর ফেজ। পাহাড়ঘেরা এ শহরের সরু ও আঁকাবাঁকা গলিতে এখনো ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চলাচল করে না।
শহরের কেন্দ্রের দিকে তাকালে চোখে পড়ে সবুজ সিরামিক টালির ছাদ। এসব ছাদের নিচেই শত শত বছর ধরে জ্ঞানের চর্চা হয়ে আসছে আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়ে।
৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আল কারাউইয়্যিনকে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বর্তমানে চালু থাকা বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় এর দুই শতাব্দীরও বেশি পরে, ১০৮৮ সালে। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয় আরও পরে।
তবে আল কারাউইয়্যিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী—ফাতিমা আল-ফিহরি।
ফাতিমা আল-ফিহরি কে ছিলেন
ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের চতুর্দশ শতাব্দীর গ্রন্থ ‘রাওয আল-কিরতাস’-এ ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তার পরিবার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের যাতায়াত ছিল।
আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে জন্ম নেন ফাতিমা। তার পুরো নাম ছিল ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরি আল-কুরাইশিয়া।
ব্যবসায়িক কারণে তার বাবা মুহাম্মাদ আল-ফিহরি পরিবার নিয়ে মরক্কোয় চলে যান এবং শেষ পর্যন্ত ফেজে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে ব্যবসায় সাফল্য পেয়ে তিনি ধনী হয়ে ওঠেন। পরিবার থেকেই ফাতিমা ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি কোরআন-হাদিস ও ফিকাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।
বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামীকে হারান ফাতিমা। একই সময়ের কাছাকাছি তিনি বাবা ও ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পদের মালিক হন তিনি ও তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি।
সম্পদ দিয়ে মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ বিলাসিতায় ব্যয় না করে মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। মারিয়াম তার সম্পদের বড় অংশ দিয়ে নির্মাণ করেন আল আন্দালুস মসজিদ।
আর ফাতিমা নিজের সম্পদ দিয়ে নির্মাণ করেন একটি বড় মসজিদ ও শিক্ষাকেন্দ্র। ইতিহাসবিদদের মতে, ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ১ রমজান এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুই বছরের মধ্যে মসজিদের মূল ভবন তৈরি হলেও পুরো কমপ্লেক্সের কাজ শেষ হতে আরও বহু বছর লেগেছিল।

ফাতিমা নিজে নির্মাণকাজ তদারক করতেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর নিজের জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ানের নাম অনুসারে এর নাম দেন ‘আল কারাউইয়্যিন’।
মসজিদ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার শুরুতে আল কারাউইয়্যিন ছিল মূলত মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে সেখানে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষাদান শুরু হয়।
মধ্যযুগে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশোনা করেছেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন, মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি ও জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজির মতো জ্ঞানী ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময়ে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনির মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে আল কারাউইয়্যিন উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু ছিল।
সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার
আল কারাউইয়্যিন কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর গ্রন্থাগার। ১৩৫৯ সালে মারিনিড রাজবংশের শাসনামলে এটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়। সেখানে মধ্যযুগের ২০ হাজারের বেশি হাতে লেখা বই রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার হাজার দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি।
সংগ্রহে রয়েছে ইমাম মালিক ইবনে আনাসের ‘আল-মুওয়াত্তা’, ইবনে ইসহাকের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী এবং ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’ ও ‘আল-ইবার’-এর পাণ্ডুলিপি। কোরআনের একটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপিও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
১৯৬৩ সালে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে আল কারাউইয়্যিনকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৫ সালে এর নামের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি যুক্ত হয়।
এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও ফেজ শহরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা আল কারাউইয়্যিন তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
বিবিসি
আয়শা/০৩ অক্টোবর ২০২৬,/বিকাল ৫:৫০
