আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইয়েমেনের চলমান সংঘাতে এই মুহূর্তে সরাসরি জড়াতে আগ্রহী নয় যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে হুতিদের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লরেঞ্জো কামেল।
তার মতে, বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সৌদি আরবের ওপর তাদের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশ্লেষণে লরেঞ্জো কামেল বলেন, ইয়েমেন যুদ্ধের আগের পর্যায়ের তুলনায় বর্তমানে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের প্রভাব অনেক বেশি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেন। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল এই প্রণালি বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
লরেঞ্জো কামেলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে অতীতে যে ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ কাজ করত, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের চাপ
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতাকেও এর একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন কামেল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান বৈশ্বিক বাজারকে এমনভাবে ব্যবহার করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়।
লরেঞ্জো কামেল বলেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইরান। তার মতে, বর্তমান সময়ে ইরান এ ধরনের চাপ প্রয়োগে জোর দিচ্ছে এবং এর লক্ষ্য হলো মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিতে একটি বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করা।
তবে ইরানের এই কৌশল সম্পর্কে লরেঞ্জো কামেলের বক্তব্য একটি বিশ্লেষণমূলক মূল্যায়ন; এটিকে ইরানের আনুষ্ঠানিক ঘোষিত নীতি হিসেবে দেখা উচিত নয়।
হুতিদের কৌশলগত সুবিধা
ইয়েমেনে হুতিরা বিদ্যমান পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য কাজে লাগাচ্ছে বলেও মনে করেন লরেঞ্জো কামেল। তার মতে, তারা পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নিয়ে নিজেদের শাসনব্যবস্থা আরও সুসংহত করার পাশাপাশি সৌদি আরবের কাছ থেকে বিভিন্ন ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে।
বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথকে ঘিরে উত্তেজনা থাকায় হুতিদের হাতে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপ তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। এই প্রণালির আশপাশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদির দীর্ঘদিনের নির্ভরতা
লরেঞ্জো কামেলের মতে, সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই নির্ভরতার মূল্য এখন রিয়াদকে দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরবকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় রিয়াদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটনের অবস্থান
কামেলের মতে, এই মুহূর্তে ওয়াশিংটন ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে চাইছে না। ফলে সৌদি আরবকে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান জোরদারের পথ খুঁজতে হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের মিসর সফরকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি। তার ধারণা, রিয়াদ আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে মিসরের সমর্থন ও সহযোগিতা চাইতে পারে। তবে কায়রো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় মিসরের কাছ থেকে সৌদি আরব কতটা নতুন ধরনের সমর্থন পাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ
লরেঞ্জো কামেলের বিশ্লেষণে, ইয়েমেন সংঘাত এখন আর শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই বা সৌদি-হুতি দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
ফলে ইয়েমেনের সংঘাতের যেকোনও নতুন উত্তেজনা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিকভাবে কতটা সম্পৃক্ত হবে এবং সৌদি আরব আঞ্চলিক মিত্রদের নিয়ে কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করবে—তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা
