আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। তখন ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করলে ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রায় ছয় মাস পর সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হরমুজ প্রণালি। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে একটি টাগবোট ডুবে গেছে এবং প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহণ করা মোট তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ যে পথে যেত, সেই হরমুজ প্রণালিই এখন দেখিয়ে দিচ্ছে— আমেরিকার সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই রাজনৈতিকভাবে জয়ী হওয়া নয়। খামেনিকে হত্যার জবাবে ইরান আত্মসমর্পণ করেনি; বরং বিদেশি জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ঘোষণা করে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের কোনো জাহাজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী পালটা-পালটি হামলা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ও ড্রোন স্থাপনায় হামলা চালায়। বিপরীতে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা ও সমুদ্রপথে মাইন স্থাপনের মতো পদক্ষেপ নেয়। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ায় অবরোধ কখনো কঠোর হয়েছে, কখনো শিথিল হয়েছে, আবারও আরোপ করা হয়েছে।
এপ্রিলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, কয়েক ডজন জাহাজকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি জাহাজ জব্দ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এতে ইরানের দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে হরমুজ প্রণালি খুলে যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধের চাপ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। ‘মিলিটারি টাইমস’, ‘টাস্ক অ্যান্ড পারপাস’ ও ‘নেভি টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ও ‘ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ’-এর কিছু নাবিক টানা ২৫০ দিনের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের কেউ কেউ খাবারের সংকট, দূষিত পানি, নষ্ট পানির ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গায় ছত্রাক জন্মানোর মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
নাবিকদের পরিবারের সদস্যরাও তাদের মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিন জাহাজে থাকার কারণে কয়েকজন নাবিক চরম মানসিক ক্লান্তিতে ভুগেছেন। এমনকি কেউ কেউ জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌবাহিনী প্রায় ১ হাজার ৬০০ নাবিকের ঘুম ও শারীরিক অবস্থার বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে।
এসব ঘটনা অবশ্যই প্রমাণ করে না যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে হেরে গেছে। তবে এগুলো দেখাচ্ছে, দীর্ঘদিনের এই সংঘাত মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। যুদ্ধ কতদিন চলবে বা কখন শেষ হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধের কারণে সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধৈর্যও ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এই সংকটকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার করছে। মে মাসে তেহরান ‘পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করে দাবি করে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। যদিও আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় প্রণালিটির জলসীমা ইরান ও ওমানের মধ্যে বিভক্ত এবং মাসকাট ইরানের এই দাবিকে সমর্থন করেনি।
হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের দাবিও কঠোর—নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা। এসব দাবি এমন কোনো দেশের অবস্থান নয়, যে দেশ শিগগিরই ভেঙে পড়ার পথে। বরং তেহরানের হিসাব হলো, তাদের প্রতিপক্ষই আগে বিকল্পহীন হয়ে পড়ছে।
এটাই ওয়াশিংটনের মূল সংকট। যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও এমন একটি জলপথ পুনরায় খুলতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র, যেটি যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১১০টি জাহাজ চলাচলের সাক্ষী ছিল। সামরিক শক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করতে যতটা কার্যকর, আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান আদায়ে ততটা কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। আরও বড় ঝুঁকি হলো, সংঘাত বাড়লে উপসাগরীয় দেশগুলো সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। আবার কোনো সমঝোতা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটলে সেটিকে পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। তারা একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে চীন, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব হরমুজ সংকটের মধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আনুষ্ঠানিক করেছে।
এই পুনর্বিন্যাসে পাকিস্তানের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান উপসাগর, ইরান, চীন ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে। ইসলামাবাদ একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করেছে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে এবং ইরান ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
একই সঙ্গে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান, যা মধ্য এশিয়ার সঙ্গে স্থলভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি সংকটের ছয় মাস পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—আমেরিকার শক্তি বা প্রভাব এখনো রয়েছে। তবে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায় না।
রাজনৈতিক সমাধানের স্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ফল হয় উলটো। অবরোধ টেকসই হয় না, মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর চাপ বাড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও বুঝতে শুরু করে যে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।
আয়শা/২৩ অগাস্ট ২০২৬,/রাত ৯:২২
