ডেস্কনিউজঃ মার্কিন বাহিনী এক সপ্তাহের মধ্যে ইরানে তৃতীয় দফায় হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের তীব্রতা এখন তুঙ্গে। সর্বশেষ, স্থানীয় সময় শনিবার (১১ জুলাই) ইরানে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক হামলার জেরে তেহরান একযোগে উপসাগরীয় পাঁচটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
রোববার (১২ জুলাই) ইরান দাবি করে, তারা বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, দক্ষিণ উপকূলীয় শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে বোমা হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ইরানের বিভিন্ন রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিতে তৃতীয় দফা হামলা চালায়। এর পরই ইরান অভিযোগ তোলে, গত ১৭ জুলাই দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ওয়াশিংটন লঙ্ঘন করেছে এবং সেই কারণেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলার নেপথ্যে?
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম দক্ষিণ ইরানে সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা চালানোর পর তারা পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ঘটনায় জাহাজের এক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে সেন্টকম জানিয়েছে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, একতরফা চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম- চুক্তি রক্ষা করুন, নাহলে মূল্য দিতে হবে। এখন বাস্তবতা দরজায় কড়া নাড়ছে।
কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু অস্পষ্টতা থাকায় উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। গত ৬ জুলাই আইআরজিসি ওমান উপকূলের কাছে একটি কাতারি এলএনজি ট্যাংকারসহ তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করে। পরে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত বাতিল ঘোষণা করেন।
এমন পরিস্থিতিতে শনিবার রাতে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
তাদের দাবি, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করায় একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। রোববার আরও একটি জাহাজে হামলার কথাও জানায় ইরান।
নতুন করে সংঘাত শুরুর পর থেকেই ইরান অভিযোগ করে আসছে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে হামলায় সহযোগিতা করছে। এর জেরে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে।
যেসব দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান
ওমান
আইআরজিসির দাবি, ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর লজিস্টিক ও জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
কাতার
ইরানের দাবি, তারা কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করেছে। তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন।
কুয়েত
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ গুদাম ও একটি রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইন
এ ছাড়া একইদিনে বাহরাইনেও হামলা চালিয়েছে ইরানি বাহিনী। দেশটির দাবি, ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
জর্ডান
আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে কমান্ড সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটছে?
ইরান জানিয়েছে, অনুমোদনহীন নৌপথ ব্যবহার করায় গত ৬ জুলাই প্রথমে একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি চালানো হয়। পরে দ্বিতীয় একটি জাহাজও অচল করে দেয়া হয়েছে।
আইআরজিসি ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথে অবৈধ নৌপথ তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, হরমুজ প্রণালিতে কেবল তাদের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করা যাবে এবং এই জলপথের ব্যবস্থাপনা তারা শুধু ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করেই করবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো ইরানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল অবাধ রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
রোববার ইরানি হামলার পর কয়েকটি দেশে বিমান হামলার সতর্কতাসংকেত (সাইরেন) বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়।
ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে ওমান বলেছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া কাতার ইরানের হামলাকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর অবমাননা বলে উল্লেখ করেছে।
দোহা জানিয়েছে, এই হামলার সব আইনি দায় ও পরিণতির জন্য ইরানই সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে।
এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের আকাশযান প্রতিহত করছে এবং বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রমের ফল।
বাহরাইনও বিমান হামলার সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানিয়েছে।
১২.০৭.২০২৬/রাত ৮.২২
