
ডেস্ক নিউজ : আওয়ামী লীগ আমলে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত) হওয়া নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তদন্ত শেষে সেই কমিটি রিপোর্ট হস্তান্তর করেছে প্রধান উপদেষ্টার কাছে। প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ভোট পড়ে।
পাশাপাশি ওই তিনটি নির্বাচনকে মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে বলা হয় রিপোর্টে। এছাড়া তিনটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হস্তান্তর করেন তদন্ত কমিটির প্রধান হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। রিপোর্ট হস্তান্তরের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে এক ব্রিফিংয়ে রিপোর্টের কিছু অংশ তিনি তুলে ধরেন। শামীম হাসনাইন বাদে পাঁচ সদস্য কমিটির বাকিরা হলেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম।
তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ফাইন্ডিংস প্রসঙ্গে শামীম হাসনাইনবলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার মিশন নেয় আওয়ামী লীগ। তারা একটি সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের পরিকল্পনা না বুঝেই নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জেতাতে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়। এমনকি, আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরণের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনও কোনও কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার শতভাগের বেশি হয়ে যায়।’২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ওই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আরেকটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ডামি প্রার্থী দিয়ে এটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার কৌশল গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করানো হয়।’
তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় বলে জানিয়েছেন শামীম হাসনাইন। তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশ রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিভিন্ন বিশেষ সেল গঠন করা হয় যা বেসিক্যালি নির্বাচন সেল নামে পরিচিত। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসন হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।’
তদন্ত কমিটির প্রধান শামীম হাসনাইন বলেন, ‘তিনটি নির্বাচন হলেও এটার মাস্টার প্ল্যান কিন্তু একটা। এই মাস্টার প্ল্যানটা হয়েছে ২০০৮ সালের পরে যখন ফার্স্ট ইলেকশনটা হলো। আর্মিদের আন্ডারে ওই সময় কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ছিল। ওখান থেকেই একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার জন্য আমেন্ডমেন্ট বাতিল করা হয় এবং আপনারা জানেন কারা কারা ছিলেন। আমি স্পেসিফিকালি সবার নাম বলছি না, রিপোর্টে সব এসেছে এবং ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার পেছনে একটা লং টার্ম স্ট্র্যাটেজি ছিল। সেই লং টার্ম স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে, ইভেনচুয়ালি যে রুলিং পার্টি যতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে, যে কোনও স্ট্র্যাটেজিতে, যেকোনোভাবে। তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা বড় বাধা ছিল। ওই সিস্টেমটা বাতিল করার পরে যে ইলেকশনটা হলো, তখন ইলেকশন কমিশনে যারা এসেছেন তারা সবাই অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এসেছে। তৎকালীন সরকার বেছে বেছে নিজেদের লোকদের নিয়ে ইলেকশন কমিশনগুলো গঠন করে।’
কমিশনের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে সাবেক এই বিচারপতি বলেন, ‘তিনটা ইলেকশন যদিও একটা মাস্টার প্ল্যানের আন্ডারে হয়, তবে তিনটা ছিল তিনরকম ইলেকশন। ২০১৪ সালেরটা ছিল নন পার্টিসিপেটরি, তারপরের নির্বাচন চলে গেছে আবার অন্যদিকে। সহিংসতা হয়েছে, প্রচারণা রেস্ট্রিকশন করে দিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় ভয় দেখানো হয়েছে, ভোট কাউন্টিংয়ে অনিয়ম হয়েছে। এগুলো করার ফলে ইলেকশন নন পার্টিসিপেট হয়ে যায়। তখন একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়, ‘বাই দ্য রুলিং পার্টি’। তখন তারা সবাইকে ইনভাইট করলো, সবাই আসলো ইলেকশনে, আসার পরে যে যেই বিশ্বাস নিয়ে তারা এসেছিল সেটা শেষ হয়ে গেল। তখন ভায়োলেন্সটা বেড়ে গেল। ওই সময় শত শত মামলা দেওয়া হল। বিরোধীদেরকে অ্যারেস্ট করা শুরু হয়ে গেল। কোর্টে গেলে জামিন দেওয়া হতো না। তার মানে জুডিশিয়ারি ওয়াজ অলসো একটিভ পার্টিসিপেন্ট।’
আয়শা/১২ জানুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:৪৪






