শাড়ি

superadmin | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২২ - ০৬:৩১:৪১ পিএম

শাড়ি
——

আমার বরের ভাষ্যমতে বৌদের শাড়িতে পরী লাগে। আমি তার পরী হবার যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছি। কুঁচি ছোট বড়, আঁচল বাম দিক থেকে ডান দিকে, কোন সমস্যা নেই। বরের চাওয়া বলে কথা। বিয়ের ছয় বছরের মাথায় বাচ্চা স্কুলে ভর্তি হলো।

শাড়ি ঘর ছেড়ে পালালো। আমি হয়ে গেলাম ওয়ার্কিং মাদার। সারাদিন বাচ্চা সামলানো, ফার্মের দেখাশোনা, রাতে হিসেব মেলানো, মেহমান, জমির খোঁজ খবর সব মিলিয়ে ভজগট।

শাড়ি জমছে আলমারিতে। পরার সময় নেই।

আমার বর অপেক্ষায় থাকে আমি কোনদিন শাড়ি পরবো। একদিন বোন এলো বেড়াতে। সাথে নিয়ে এলো কমলা শিফন শাড়ি আর কালো জমাট পুঁতির মালা। আমি শাড়ি পরে বরের সামনে গেলাম। উনি মুগ্ধ হয়ে বললেন – ইশ মনে হচ্ছে অন্য বাড়ির বৌ।

কী যেন ছিল তার কথায়, আমি খুব লজ্জা পেলাম।

উনি ঘুরেফিরে আমায় কালো শাড়ি কিনে দিতেন। আমি বলতাম – আমার বরের ধারণা তার বৌ সাদা ফর্সা, তাই সব শাড়ি কালো।

একবার শখ করে কিনলাম নীল রঙের ‘বিবি রাসেল শাড়ি।‘ বর বেচারা পারলে শাড়িকে এওয়ার্ড দেয়। আহা খুব ভুল হয়ে গেছে, কেন তোমায় এতদিন নীল পরতে দেইনি। তারপর শুরু হলো নীলের পালা। তাক ভর্তি নীল শাড়ি। আশেপাশের বাড়ির ননদেরা পর্যন্ত আমার নীল শাড়ি ঘুরেফিরে চেয়ে নিয়ে পরতো।

– ভাবি তোমার অসাধারণ পছন্দ ।আকাশ নীল, গাঢ় নীল, সমুদ্র নীল, ফিরোজা নীল, অপরাজিতা নীল, ময়ূর নীল, কালচে নীল, ধূসর নীল কী নেই তোমার !

– আমার ছোট মেয়ে বলতো আমার আম্মা হচ্ছে নীলপরী।

ডা. ভাতিজির বিয়ে হচ্ছে। বর আসবে সকাল সাড়ে আটটায়, নয়টায় বিয়ে। যেহেতু তারা দূর থেকে আসছে তাই সারাদিন থাকবে। আমি সারাদিন পিঠা বানাই, সাথে নানান পদের নাস্তার আইটেম। ভেজিটেবল রোল বানাই রাত জেগে।

গায়ে হলুদে সবাই শাড়ি পরলো। আমার পরার সময় নেই, কারণ – আমি পায়েশের উপরে নাম লিখছি। আনারস সাজাচ্ছি।
সবাইকে নাস্তা দিচ্ছি। ভাতিজিকে শাড়ি পরাচ্ছি।

রাত দুইটায় গিয়েছি বিছানার সাথে দেখা করতে, ভোর পাঁচটায় উঠতেই হবে। জেরিনকে নিয়ে ভোর ছয়টায় পার্লারে যেতে হবে।
রুমে এসে দেখি বাচ্চাদের বাবা জেগে আছে। হাতে সিগারেট। আমি একটু লজ্জা পেলাম সবাইকে সময় দিতে গিয়ে আমি সম্ভবত বর বেচারার কোন খেয়ালই রাখছি না।

গোসল সেরে তার পাশে শুতেই সে আমাকে একটা নীল প্যাকেট দিল – শাড়িটা কাল পরবে। আজ হলুদে সবাই শাড়ি পরলো তুমি বাদে। তোমার কী হলুদ শাড়ি নেই?

– আছে তো। বলতে বলতে প্যাকেট খুললাম – হলুদ আর নীল জমিনে সোনালি কাজকরা একটা শাড়ি। কী মোলায়েম…!

– দেখেই মন ভরে গেল। সে আমার খোলা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল – চুল খোলা রেখো। তোমার চুল অসম্ভব সুন্দর। খোঁপা বেঁধে নষ্ট করো না।

– আমি তার বিশাল শরীরের কোণায় নিজেকে লুকিয়ে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।

ঘুম ভাঙ্গলো এলার্ম এর শব্দে। সব ফেলে হাতের সামনে যে সালোয়ার কামিজ পেলাম সেটা পরেই দে দৌঁড়্।

সারাদিন বিয়ে, সকালের নাস্তা, দুপুরের খাওয়া, লোডশেডিং এ পাখার ব্যবস্থা করা। বরের হাত ধোয়ানো, বরের বোনের বাচ্চার জন্য খালি রুম, বিছানা সহ রেডি করা। বিকেলের স্ন্যাকস, পান, হাত ধোয়া এসব করতে গিয়ে দেখি, বিকেল পার হয়ে গেছে।

বারান্দা থেকে চোখ পড়লো আমার রুমে। আমার বর জানালার ধারে বসে আছে। তার এই বসে থাকার ভঙ্গি আমি চিনি। আমার হঠাৎ মনে হলো।

আমি তো তার আবদার মেটাইনি।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি মাংসের ঝোল আর কেকের ক্রিমের দাগ লাগা সাদা সালোয়ার কামিজ আমার পরণে। অগোছালো, না আঁচড়ানো চুল কাঁটায় আঁটকানো।

আমি দৌঁড়ে রুমে গেলাম। শাড়িটা হাতে নিয়েছি পরবো। ঠিক তখন মেঝ ভাস্তি ডেকে বলল – চাচি, বরযাত্রী চলে যাচ্ছে। এখনি আসুন।
আমি শাড়ির প্যাকেট ফেলে। দৌঁড়ে গেলাম।

আমার মেজ ভাশুর হঠাৎ বললেন – বরযাত্রী চলে যাচ্ছে ‘চা’ না খেয়ে, কী করো তোমরা।

– আমি চা বানাতে চুলা জ্বালিয়ে গ্যাস লাইটার রাখলাম চুলার পাশে, দশ সেকেণ্ডের মাথায় ‘লাইটার বিস্ফারণ হলো ‘ আমি মুখ সরিয়ে নেয়ার জন্য এক মুহূর্ত সময় পেলাম মাত্র। আমার ওড়নায় আগুন লেগে গেল। গলায় আর বুকে তাপ লাগলো। আমার চিৎকারে বাবুর্চিরা দৌঁড়ে এলো।


– একসময় বরযাত্রী চলেও গেল। আমি গলা আর বুকে বরফ আর পানি চেপে শুয়ে আছি।
– সেদিন আর শাড়ি পরা হলো না।

এই বিষয়টা আমার বাচ্চাদের বাবার মনে গেঁথে রইলো বহুকাল।

সে প্রায়ই বলতো, আমি তো শুধু চেয়েছিলাম, তুমি শাড়িটা পরো।

এরপরে একদিন আমার এনজিওগ্রাম হলো। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের ডা. আমায় বললেন – আপনি শাড়ি পরবেন না। হঠাৎ সমস্যা হতে পারে। সালোয়ারকামিজ পরবেন সবসময় যেন কোন মতেই কোন পোশাক আপনার আটোসাঁটো না হয়।

আমার কিছু হলো না। আমার বর শুধু বলল – আমার জন্য পরবে। হালকা করে। কোথাও যেতে হবে না
শুধু আমিই দেখবো।

প্রায় একযুগ শাড়ি পরি না। হঠাৎ কোন অকেশনে দুই / পাঁচ মিনিটের জন্য পরেই আবার সালোয়ার কামিজে চলে গিয়েছি। অলটার্নেট ড্রেস সবসময় আমার ব্যাগে থাকে।

মনের জানালার শারমিন আপা নক দিলেন – আপু আসতে হবে শাড়ি পরে।
জামদানী পরবেন। সম্ভব হলে নীল। নীল শাড়ির পশরা খুলে ফেললাম।
এবার আপনারাই বলুন কোন শাড়িটা পরলে ভালো হয়।

আর হ্যাঁ ছোট্ট একটা টিপস – কাছের মানুষটির জন্য হলেও শাড়ি পরুন। তারপর খোলা চুলে তার হাত ধরে বলুন। চলো – ‘ আজকের সন্ধ্যাটি হোক, শুধু তোমার আর আমার।‘

 

 

কবি পরিচিতিঃ নিতু ইসলাম নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর আবেগঘন লেখা হাহাকার সৃষ্টি করে। পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পেশাগত জীবনে জীবনে গৃহিণী। নিতু ইসলাম বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা পাবনা জেলায়। রাঁধতে, বই পড়তে,ও লিখতে ভালোবাসেন। পাবনার আদি নিবাসেই তাঁর জীবন যাপন।

কিউএনবি/বিপুল/২৫.০৭.২০২২/সন্ধ্যা ৬.২৫

▎সর্বশেষ

ad