ইরানি হামলার ভয়ে কেন কাঁপছে বুলগেরিয়ার গ্রামটি?

Anima Rakhi | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২৬ - ০৪:৩৭:২৪ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বুলগেরিয়ার বেজমির বিমানঘাঁটি থেকে মার্কিন বিমানবাহিনীর দুটি জ্বালানিবাহী বিমান চলে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও গ্রামজুড়ে আতঙ্ক কমেনি। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিতার স্তোয়ানভ গত শনিবার নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন বিমানবাহিনীর ট্যাংকারগুলো বুলগেরিয়া ত্যাগ করেছে। একই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি ইলিয়ানা ইয়োতোভা উল্লেখ করেন, আপাতত এই বিশেষ মিশনটি শেষ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অন্যান্য পরিচালনগত চাহিদা মেটাতে বোয়িং কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকারগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের ইরানকেন্দ্রিক অভিযানের জের ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিজেদের দোরগোড়ায় এসে পড়ার যে আশঙ্কা গ্রামে দেখা দিয়েছিল, তা এখনো কাটেনি।

ইরান সরকার আগে থেকেই বুলগেরিয়াকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার বিষয়ে সতর্ক করে আসছিল। পরবর্তীতে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস একাধিক সূত্রের বরাতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি আরও সংঘাতময় করে তুললে বুলগেরিয়ার বেজমির বিমানঘাঁটি মার্কিন বিমান ব্যবহারের অনুমোদনের জবাবে সেখানকার মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মূল্যায়ন করেছে ইরানি বাহিনী। এই পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় একজন মুদি দোকানদার আল জাজিরাকে জানান, বিমানগুলো যাওয়ার আগেই গ্রামবাসী চরম ভয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন এবং সৃষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। 

প্রায় এক হাজার জনসংখ্যার বেজমির গ্রামে বিমানঘাঁটির কার্যক্রম ও উড়োজাহাজের বিকট শব্দ নিত্যদিনের পরিচিত ঘটনা। স্থানীয় মেয়র রসেন রুসেভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের বহু মানুষই দীর্ঘ দিন ধরে এই বিমানঘাঁটিতে কর্মরত। কিন্তু গত জুলাই মাসের শেষদিকে সরকার বিমানঘাঁটিতে আটটি পর্যন্ত মার্কিন স্ট্র্যাটোট্যাংকার এবং ২৫০ জন সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দেওয়ার পরপরই প্রতিবাদে নামেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি বিবেচনা করে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে গ্রামবাসী ও আশপাশের মানুষ মিলে তিন হাজারেরও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন এবং বিমানঘাঁটির পাশে শান্তিপূরণ বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই যুদ্ধসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড থেকে নিজের গ্রামকে রক্ষা করা।

ট্যাংকারগুলো চলে যাওয়ার সংবাদে শুক্রবারে গ্রামে স্বস্তির আবহ ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান মেয়র রুসেভ। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসী মনে করছেন যে তাঁদের দাবি ও উদ্বেগ সরকারের কানে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বুলগেরীয় সরকার বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলেছিল, সামরিক গোয়েন্দা তথ্যে কোনো নিরাপত্তা হুমকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং যুক্তরাজ্যের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও আক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবুও সাধারণ মানুষের আতঙ্ক পুরোটা কাটে না। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ডিঙ্কা তোদোরোভা এবং গাঙ্কা ভ্লায়েভা তীব্র উদ্বেগের সাথে জানান, বিমানঘাঁটিতে তাদের সন্তানরা কাজ করায় প্রতিদিন তারা চরম আতঙ্কে থাকেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের কথা না শুনে নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যার মাশুল দিতে হতে পারে শিশুসহ নিরীহ মানুষদের।

তবে গ্রামের সবার ভাবনা একরকম নয়। ৩৩ বছর বয়সী ইভান নামের এক যুবক মনে করেন, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এই আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে এবং বেজমির গ্রামের জন্য বড় কোনো বাস্তবিক আশঙ্কা নেই। তার মতে, কৃষ্ণসাগর পেরিয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়েই আলোচনা করা উচিত। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে বাচ্চাদের মানসিক চাপ কমাতে আন্তোনিয়া ইভানোভা নামের এক নারী একটি সাদা কাপড় টাঙিয়ে ভূ-আলোকচিত্র ঢেকে প্রজেক্টরের মাধ্যমে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। একই এলাকার আরেক মা চনকা মস্কোভা বলেন, সংবাদের প্রচারণায় বিষয়টি খানিকটা বাড়িয়ে বলা হলেও সব সিদ্ধান্ত তো সরকারের হাতেই থাকে।

পুরো সময়টিতে মেয়র রুসেভ গ্রামবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চায়তা ও সরকারি তথ্যের স্বচ্ছতা আনার জন্য কাজ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, এই প্রতিবাদের লক্ষ্য সরকার ফেলে দেওয়া নয় বরং সঠিক তথ্য পাওয়া। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুঞ্জন গ্রামবাসীর মনে ভয় বাড়াতে ভূমিকা রাখে, তবে এলাকায় টহল দেওয়া সামরিক পুলিশ কাউকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে, আবার কারো ক্ষেত্রে বেড়েছে উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে বুলগেরিয়া থাকলেও ইউরোপের বুকে বাস্তবিক সামরিক হামলা চালানোর ইচ্ছা বা সক্ষমতা ইরানের কতটুকু আছে তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।

সম্প্রতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ স্পষ্ট করেছেন, মার্কিন ট্যাংকারগুলো কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয়নি বরং ন্যাটো সহযোগীদের সাথে মহড়ায় যুক্ত থেকেছে। কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন ও ইসরায়েলি পদক্ষেপকে সমর্থন করে এমন যে কোনো ভূমিকার জবাব দেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বুলগেরিয়ার জনগণের সাথে তাদের কোনো বিরোধ নেই, তবে সামরিক সহায়তা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বর্তমানে ঘাটিতে বুলগেরীয় সামরিক হেলিকপ্টারের ওঠানামা যথারীতি চললেও বেজমির গ্রামবাসীর মনে একটাই প্রার্থনা, কোনো স্বার্থের সংঘাত যেন তাদের স্বাভাবিক জীবনকে আর কখনো এভাবে বিপর্যস্ত না করে।

সূত্র: আল জাজিরা

কিউটিভি/অনিমা/২৬ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৪:৩৬

▎সর্বশেষ

ad