হিন্দ রাজাব হত্যাকাণ্ড: ইসরাইলের দায়মুক্তি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা

Ayesha Siddika | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ - ০৪:১৪:১৪ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অস্বীকারের পর এবার বিষয়টি নতুন ধরনের দায়মুক্তির দিকে মোড় নিতে পারে। ইসরাইল ঘোষণা করেছে, পাঁচ বছর বয়সি ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করা হবে। ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি গাজায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর হিন্দ একটি গাড়ির ভেতরে আটকা পড়েছিল। পরে ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ইসরাইলি সেনাদের বাধার কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর দাবি ছিল, তাদের দিকে এগিয়ে আসা একটি গাড়িতে তারা গুলি চালিয়েছিল। অথচ ওই গাড়িতে থাকা হিন্দের পরিবার সেদিনই গাজা সিটি থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর ইসরাইলের দেওয়া সরে যাওয়ার নির্দেশনা অনুসরণ করছিল। হিন্দের ঘটনা নিয়ে ইসরাইলের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেও দেখা হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) ত্রাণকর্মীদের বহরে হামলার ঘটনায় ইসরাইলি সেনাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেখানে আইডিএফের দাবি ছিল, সেনারা ভুলভাবে মনে করেছিল হামাস ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

২০২৪ সালের আরেকটি হামলার ক্ষেত্রেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছিল, ভবনটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে বিষয়ে তাদের কাছে হালনাগাদ তথ্য ছিল না। আর ২০২৩ সালের আরেক ঘটনায় ইসরাইলের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার বিপরীত দিকে চলাচল করায় একটি বহরকে ‘বাস্তব হুমকি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল বলে জানানো হয়। হিন্দ রাজাবের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যা ঘটেছে, তা মূলত আগের বর্ণনার পরিবর্তন। কিন্তু বর্ণনা বদলে যাওয়া আর হত্যাকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নিজেদের রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে—এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। কারণ, আগের অস্বীকারের কারণে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ইতোমধ্যে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

হিন্দের দাদি একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবারটি শুধু হিন্দের জন্য বিচার চাইছে না। বরং তারা গাজায় নিহত সব শিশুর জন্য জবাবদিহি চায়। তার ভাষায়, পরিবার শুধু গাজার একটি শিশু হিসেবে হিন্দের হত্যার বিচার দাবি করছে না; বরং গাজায় নিহত সব শিশু শহীদের পক্ষেই বিচার চাইছে। হিন্দের বিচারপ্রক্রিয়া এরই মধ্যে নানা প্রশ্নে ঘেরা। তবে তার পরিবারের এই অবস্থান আরও বড় একটি দায়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। তারা হিন্দকে শুধু একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ না দিয়ে গাজায় নিহত সব শিশুর হত্যার জন্য দায় নির্ধারণের দাবি তুলেছে।

ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহত সব শিশুর জন্য বিচার দাবি করে হিন্দের পরিবার এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই সংঘাতের সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার ঘাটতিও সামনে এনেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ইসরাইলের দায়মুক্তিকে টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে হিন্দের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্তের ঘোষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি বার্তাও তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও অনুমোদনের মধ্যেই গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু ঘটেছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, তদন্ত ও আন্তর্জাতিক অনুমোদন কি একই চক্রের অংশ হয়ে উঠছে? একটি শিশুর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করলেই যদি বৃহত্তর হত্যাকাণ্ডের দায়ের প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়, তাহলে তা ন্যায়বিচারের পরিবর্তে দায়মুক্তিকেই শক্তিশালী করতে পারে। হিন্দ রাজাবের ঘটনা তাই শুধু একটি শিশুর হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয় নয়। এটি ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা এবং গাজায় নিহত হাজারো শিশুর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।

সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর

 

 

আয়শা/২৩ অগাস্ট ২০২৬,/বিকাল ৪:১২

▎সর্বশেষ

ad