শহীদ আহমদ খান সিলেট প্রতিনিধি : সাংস্কৃতিক সংগঠন মেঠোসুর-এর উদ্যোগে শিশু-কিশোরদের নিয়ে ২৪ জুলাই, শুক্রবার দিনব্যাপি অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী ‘ঋতুবীক্ষণ’ বর্ষা ঋতু উৎসব উদযাপন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। শিশু-কিশোরদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষে প্রত্যেক ঋতুতে সংগঠনটি এমন আয়োজন করে থাকে।
দিনব্যাপি বর্ষাঋতুকে উপলক্ষ করে শ্রাবণ দিনে সিলেটের বিভিন্ন এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ভ্রমণে সংগঠনটির কয়েকজনের সাথে শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকসহ প্রায় অর্ধশতজন অংশগ্রহণ করে। মেঠোসুর ঋতুবীক্ষণ পরিবারের সভাপতি অঞ্জন সরকারের সভাপতিত্বে ঋতুবীক্ষণ আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক, লেখক দেবব্রত রায় দীপন, সংগঠক শাহজাহান কবির, মিনতি তালুকদার, বিপ্লব বিহারী সরকার, পুন্ডিবাড়ী, কোচবিহার; সঙ্গীতশিল্পী দীপালী তালুকদার, ইমন দাস, বাবুল আহমেদ ফাতাহ।
আরও উপস্থিত ছিলেন সংগীতশিল্পী ঝলক চৌধুরী, উদীচীকর্মী সন্দ্বীপ দেব, বাদল দাস, জয়ন্ত দাস, সৌমিক দাস, দীপ দাস, অভিজিৎ দে, দিয়া তালুকদার দীপা, ইসমাইল ইসলাম, আলেয়া আক্তার, আকবর হোসেন, ওয়াদুদ ইসলাম, ওয়াফি, পিয়াল দাস, অরিত্র রায়, আন্নি দেব, সায়ান চক্রবর্তী, মুন দেব, আরতি দেব, রাধা রানী দেব, ইব্রাহিম আলী, আঁখি আক্তার, প্রমি দাস সুপ্রিয়া, সুজাতা দাস গুপ্ত, সম্পা তালুকদার, বাণীব্রত তালুকদার উল্লাস, ইমন দাস, তমাল দেব, ইচ্ছে দাস, ঈশান দাস, আনন্দ তালুকদার, ঈষাণ বনিক, অদ্রিজ তালুকদার, রত্না বাউরী, শীপন চাষা, আদি বাউরী, উজ্জ্বল বাউরী, অজিত সরকার প্রমুখ।
অংশগ্রহণকারীরা নদী, হাওর, পাহাড় ও চা-বাগানের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর পরিদর্শন করেছে। এ আয়োজনে অংশগ্রহণ করে কিশোর মাহী জানায়, আমার বাবা নেই। সংগঠনের একজন আমাকে বিভিন্ন সময়ে বাবার মতো উপদেশ এবং স্নেহ করেন। উনি আমন্ত্রণ করেছেন। এসে অনেক ভালো লাগছে। ভালো জায়গা দেখলাম, গান শুনলাম, গাইলাম, কবিতা আবৃত্তি করলাম। তাছাড়া দুপুরে একসাথে সবাই মিলে আখনী-ডিমভুনা দিয়ে খাওয়া-দাওয়া হলো। আমি অনেক খুশি। আমাকে আবারো বললে আমি আসবো।
অংশগ্রহণকারীরা দিনভর বিভিন্ন স্থানে, সাদাপাথরে ভ্রমণের সময় সাংস্কৃতিক আনন্দ আয়োজনে অংশ নেয় এবং শেষে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী রথমেলা ঘুরে কার্যক্রম সম্পন্ন করে। কর্মসূচির শুরুটা ছিল সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত হাছন রাজা জাদুঘর পরিদর্শনের মাধ্যমে। আয়োজক সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরে ছয়টি ঋতুকে কেন্দ্র করে শিশু-কিশোরদের নিয়ে ‘ঋতুবীক্ষণ’ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের নিজেদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। সংবেদনশীল প্রজন্ম গড়তে এসব প্রচেষ্টা।
সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসকারী এক নারী তাঁর দুই কিশোর-কিশোরী সন্তানসহ ঘুরে এসে জানান, এটি তার টানাপোড়েনের সংসারে সুন্দর মুহূর্ত। সবাইকে এক পরিবারের মানুষ মনে হয়। উপস্থিত সাংবাদিক, লেখক দেবব্রত দীপন বলেন, এ উদ্যোগ সত্যিই অনন্য। কয়েকটি ভ্রমণে আমি তাদের সঙ্গী হয়েছি। ভীষণ অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তবুও এইখানে আসলে আমি প্রাণ পাই। নবীন হয়ে উঠি। শুরুর দিকে এই কার্যক্রমের অতিথি থাকলেও এখন আমি নিয়মিত একজন কর্মীও।
অন্যতম সমন্বয়কের ভূমিকায় থাকা সিলেট হাছন রাজা জাদুঘর (মিউজিয়াম অব রাজাস)-এর সহকারী জাহাঙ্গীর আহমেদ বলেন, জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজের পাশাপাশি আমি মেঠোসুরে কাজ করে ভীষণ আনন্দ পাই। চিরায়ত বাংলার এক অনন্য মরমিকবি ও গীতিকার হাছন রাজার জীবনী আমাকে সহজিয়া পথে ধাবিত করে। মনন ও সৃষ্টিশীল তাড়নাতেই মেঠোসুর পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে বিভিন্ন সময় নানাবিধ কাজে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি৷
আয়োজনটিকে আরও সাফল্যমণ্ডিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলেন ‘ঋতুবীক্ষণ’ কর্মসূচীর সভাপতি কাস্টমসে কর্মরত অঞ্জন সরকার। তিনি বলেন, সমাজের শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও সময় সুযোগ হয়ে উঠে না। বিমান তালুকদার ও তার সঙ্গীদের সাথে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকার চেষ্টা করি। আরেকটু ভালো কিছু যদি করা যায়। সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে। এই উদ্যোগে অংশগ্রহণকারী সকলকে তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
ভবিষ্যতেও শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। শিশু-কিশোরদেরকে আনন্দ আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে পেরে ‘ঋতুবীক্ষণ’ কর্মসূচীর অনন্য উদ্যোক্তা বিমান তালুকদার বলেন, বাচ্চাদের হাসিখুশি ভাব দেখতে অপূর্ব লাগে। বেশিকিছু চাই না। আনন্দপূর্ণ অবস্থায় তারা বড় হোক। দায়িত্ব নিতে শিখুক। তিনি বলেন, প্রভূত প্রযুক্তি বিকাশের যুগে মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। ঋতুবৈচিত্রের রূপটাও এ যুগের বাচ্চারা উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে না।
যারা সচরাচর টাকা-পয়সা খরচ করে ঘুরাঘুরি করতে পারবে না বেশিরভাগ এমন শিশু-কিশোরদের সাথে নিয়েই আমাদের এ আয়োজন। সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রায় সকলেই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। কয়েকটি ধাপের সাংস্কৃতিক পর্ব শেষে শিশু-কিশোরদের হাতে বিভিন্ন পর্যায়ে বসন্ত বিশ্বাস পাঠাগার ও সংস্কৃতিজন ফয়েজ আহমেদের সৌজন্যে পুরস্কার স্বরূপ বই তুলে দেয়া হয়।
আয়শা/২৬ জুলাই ২০২৬,/রাত ১০:০৫
