হামলার জন্য প্রস্তুত ইরানের ১৫০০ মিসাইল?

Anima Rakhi | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ১০:০৯:৪৯ এএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : তেহরানের সামরিক শক্তি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের বারো দিনের যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরান তাদের হারানো শক্তি পুনরুদ্ধারে যে গতি দেখিয়েছে, তা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। 

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রেখেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।

সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান তাদের শিল্প সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলছে। যুদ্ধের সময় বেশ কিছু উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাটির গভীরে অবস্থিত তাদের সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র শহরগুলো এখনো অক্ষত রয়েছে। এই ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরি এবং কারখানাগুলো ব্যবহার করেই তেহরান তাদের কঠিন জ্বালানিচালিত ফাতাহ-১১০ এবং খাইবার শেকানের মতো বিধ্বংসী সিস্টেমগুলো পুনর্গঠন করছে।

ইরানের এই আধুনিক অস্ত্রভাণ্ডারে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো খোররামশাহর-৪ (খাইবার)। দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রটি বিশাল ওজন বহনে সক্ষম এবং এর নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষমতা একে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে। যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি না করার দাবি করে আসছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, যেকোনো সময় এই সীমা অতিক্রম করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এর ফলে কেবল ইসরায়েল নয় বরং দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একাংশ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও এখন তেহরানের সরাসরি নিশানায় রয়েছে।

ফাত্তাহ সিরিজের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও সামরিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। ইরান দাবি করছে, তাদের ফাত্তাহ-১ ক্ষেপণাস্ত্রটি শব্দের চেয়ে ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেশি দ্রুতগতিতে ছুটতে পারে, যদিও পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে গত কয়েক বছরের সংঘাতে দেখা গেছে, ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে না পারলেও বিপুল সংখ্যায় উৎক্ষেপণের মাধ্যমে যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে সক্ষম।

ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের পর ইরানের হাতে মাত্র ২০০টির মতো লঞ্চার বা উৎক্ষেপক অবশিষ্ট ছিল। তবে দেশটির শিল্প খাত বর্তমানে প্রতি মাসে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করায় সেই ঘাটতি খুব দ্রুত পূরণ হয়ে যাচ্ছে। ইরানের এই দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে তারা কেবল প্রতিরক্ষামূলক নয় বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই আক্রমণাত্মক সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে যা অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

অতীতের বিভিন্ন হামলা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো স্থির এবং নরম লক্ষ্যবস্তুর ওপর বেশ কার্যকর। বিশেষ করে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ইরাকের এরবিল বা সিরিয়ার ইদলিবে চালানো হামলায় ইরান তাদের নির্ভুল লক্ষ্যভেদের প্রমাণ দিয়েছে। যদিও ইসরায়েলের অ্যারো-৩ বা ডেভিডস স্লিংয়ের মতো উন্নত ইন্টারসেপ্টরগুলো অধিকাংশ মিসাইল রুখে দিতে সক্ষম কিন্তু যখন ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে শুরু করে তখন সেই প্রতিরক্ষা প্রাচীরে ফাটল ধরার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালের সংঘাতের সময় দেখা গিয়েছিল যে প্রথম কয়েক দিনের প্রবল আক্রমণের পর ইরানের সরবরাহ লাইনে কিছুটা টান পড়েছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তেহরান তাদের সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। সলিড-ফুয়েল মিসাইলগুলো খুব দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা যায় এবং এগুলো মোবাইল লঞ্চারের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া সহজ, যা শত্রুপক্ষের জন্য আগাম শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে।

এই বিশাল মিসাইল শক্তি এখন তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। বিমান শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাধ্যমেই তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। সামনের দিনগুলোতে ইরানের এই প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং পশ্চিমা জোটের প্রতিরক্ষা কৌশলের মধ্যকার এই লড়াই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: নাইনটিন ফোরটি ফাইভ

অনিমা/২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/সকাল ১০:০৯

▎সর্বশেষ

ad