ডেস্ক নিউজ : প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে কিংবা কাজের ফাঁকে আমরা অনেকেই মুখে উচ্চারণ না করে শুধু মনে মনে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করি কিংবা প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করি। এটি আমাদের অনেকেরই একটি সুন্দর অভ্যাস। তবে মাঝেমধ্যে একটি প্রশ্ন আমাদের মনে দোলা দেয়— মুখে কোনো শব্দ না করে বা ঠোঁট না নাড়িয়ে কেবল মনে মনে এই জিকির ও দরুদ পড়লে কি আসলেই পূর্ণ সওয়াব মেলে? ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ও চমৎকার দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা আমাদের ইবাদতের সঠিক নিয়ম জানতে সাহায্য করে।
দরুদ পাঠের মর্যাদা ও মহিমা
দরুদ পাঠ মহান আল্লাহর অত্যন্ত ভালোবাসার একটি আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দরুদ ও সালাম পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার ওপর দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৬)
একইভাবে হাদিস শরিফে দরুদ পাঠের অগণিত ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا
‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর ১০ বার রহমত বর্ষণ করেন।’ (মুসলিম ৪০৮)
মনে মনে জিকির ও দরুদ পড়ার বিধান
জিকিরের একটি বড় দিক হলো অন্তরের উপস্থিতি। হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ করার গুরুত্ব ইসলামে অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী জিকির ও দরুদের পূর্ণাঙ্গ সওয়াব পেতে জিহ্বা ও ঠোঁট নাড়িয়ে অন্তত নিজেকে শুনতে পাওয়ার মতো করে উচ্চারণ করা উত্তম। জিহ্বা দিয়ে মহান আল্লাহর জিকির সচল রাখার প্রতি তাগিদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—
أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ شَرَائِعَ الْإِسْلَامِ قَدْ كَثُرَتْ عَلَيَّ، فَأَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ أَتَشَبَّثُ بِهِ. قَالَ: لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ
‘এক ব্যক্তি আরজ করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার জন্য ইসলামের বিধানাবলী অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাই আমাকে এমন একটি আমল বা মূলনীতি বলে দিন যা আমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরব। নবীজি (সা.) বললেন, তোমার জিহ্বা যেন সবসময় আল্লাহর জিকিরে সিক্ত ও চঞ্চল থাকে।’ (তিরমিজি ৩৩৭৫)
আলেম ও ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী
মনে মনে পড়া: অন্তরে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং নীরবে মনে মনে দরুদ ও জিকির করা সম্পূর্ণ বৈধ। এটি কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয় এবং এতে অবশ্যই সওয়াবের আশা করা যায়।
মুখে উচ্চারণ করা: তবে সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে মুখের জিহ্বা ও ঠোঁট নেড়ে উচ্চারণ করে পড়া অনেক বেশি ফজিলতপূর্ণ ও উত্তম। বিশেষ করে যে আমলগুলোর কথা হাদিসে মুখে উচ্চারণের নির্দেশসহ এসেছে, সেগুলো সম্ভব হলে উচ্চারণ করাই শরিয়তের কাম্য নিয়ম।
পরিস্থিতির সাপেক্ষে করণীয়
কাজেই, ব্যস্ততা, সফর, অসুস্থতা বা এমন কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যেখানে মুখে শব্দ করে বা ঠোঁট নাড়িয়ে পড়ার সুযোগ বা পরিবেশ নেই— সেখানে অন্তর থেকে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি যাই হোক, মনে মনে দরুদ ও জিকির চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে যখনই সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যাবে, তখন জিহ্বা ও ঠোঁটের মাধ্যমে জিকির ও দরুদ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
সংক্ষেপে বলা যায়, মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করা বা দরুদ পড়া কখনোই বিফলে যায় না; এর মাধ্যমেও নেকি অর্জিত হয়। তবে সর্বাত্তম সওয়াব ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের পূর্ণ অনুসরণের জন্য মুখের উচ্চারণ ও অন্তরের আবেগের মিলন ঘটানোই শ্রেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের হৃদয় ও জিহ্বা—উভয়কেই সর্বদা তার জিকির ও প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পাঠে সিক্ত রাখার তৌফিক দান করুন। আমিন।
আয়শা/২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৩০
