স্পোর্টস ডেস্ক : ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে—লিওনেল মেসি নাকি অন্য কেউ? এই বিতর্কের যেন কোনো শেষ নেই। দীর্ঘদিনের সেই আলোচনায় এবার সরাসরি কোনো তর্কে না গিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের সাফল্যের ‘রসিদ’ দেখিয়ে জবাব দিয়েছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অভিনব পোস্টটি প্রকাশের পরই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
নতুন একটি ব্র্যান্ড ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে তৈরি করা ওই পোস্টে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পুরো পথচলাকে প্রতীকী একটি ‘রসিদে’ সাজানো হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ও অর্জনের তালিকার শেষে রাখা হয়েছে সবচেয়ে আলোচিত বার্তা—‘GOAT’ বিতর্কের যেন সেখানেই সমাপ্তি।

রসিদে বিশেষভাবে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির বড় অর্জনগুলো। রয়েছে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ জয়, একাধিক কোপা আমেরিকা শিরোপা, অলিম্পিক স্বর্ণপদক এবং ফিনালিসিমা জয়ের তথ্য। একই সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোটি কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করার বিষয়টিও জায়গা পেয়েছে সেই প্রতীকী বিলে। মেসির এমন পোস্টের সময়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঠিক তখনই এমন বার্তা সামনে এলো।
তবে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথচলা সবসময় সাফল্যে ভরা ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে সমালোচনা এবং হতাশাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার ছিল সেই হতাশার অন্যতম বড় উদাহরণ। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয় আর্জেন্টিনা।
২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসেন জাতীয় দলে। এরপরই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে ২৮ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা। মেসির হাতেও ওঠে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই স্মরণীয় ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচের স্কোর ছিল ৩-৩। মেসি করেন দুটি গোল এবং টাইব্রেকারে একটি পেনাল্টিও সফলভাবে কাজে লাগান। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জয় পেয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা। কাতার বিশ্বকাপই ছিল মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ২০১৪ সালে যে ট্রফি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, আট বছর পর সেই বিশ্বকাপই হাতে তুলে নেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিয়ে ফুটবল ইতিহাসে নিজের অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে যান এই তারকা।
বিশ্বকাপ জয়ের পরও থামেননি মেসি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন আরেকটি আন্তর্জাতিক সাফল্য। ফলে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও অলিম্পিক স্বর্ণপদক—জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য বড় অর্জনগুলোর প্রায় সবই এখন তার ক্যারিয়ারের অংশ।
বিশ্বকাপের মঞ্চেও মেসির পরিসংখ্যান তাকে আলাদা করে রেখেছে। ২০০৬ থেকে ২০২৬—ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছেন তিনি। ৩৪ ম্যাচে তার গোল ২১টি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলসংখ্যার দিক থেকে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তার ওপরে রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, যার গোল ২২টি।
২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার অন্যতম ভরসা ছিলেন মেসি। টুর্নামেন্টে তার নামের পাশে ছিল আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট। আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। বিশ্বকাপে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের গোলসংখ্যাও একসময় ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন মেসি, যদিও পরে তাকে পেছনে ফেলেন এমবাপ্পে।
সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ক্যারিয়ার যেন এক পূর্ণাঙ্গ গল্প—হতাশা থেকে প্রত্যাবর্তন, ব্যর্থতা থেকে সাফল্য এবং সমালোচনা পেরিয়ে কিংবদন্তির আসনে পৌঁছে যাওয়া। সেই দীর্ঘ যাত্রাকেই এবার প্রতীকী ‘রসিদে’ তুলে ধরেছেন তিনি।
রসিদের শেষেও তাই নেই কোনো বিলের অঙ্ক, বকেয়া কিংবা টিপসের হিসাব। রয়েছে শুধু মেসির বার্তা—‘GOAT debate—settled’। ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে, সেই বিতর্ক হয়ত ভবিষ্যতেও চলবে। তবে নিজের ক্যারিয়ারের অর্জনের ‘রসিদ’ সামনে রেখে মেসি অন্তত নিজের অবস্থান সম্পর্কে বার্তাটি বেশ স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন।
আয়শা/০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,/সন্ধ্যা ৭:০০
