
ডেস্ক নিউজ : স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাদামাটা, সৎ ও পরিমিত জীবনযাপন সর্বমহলে প্রশংসিত এবং অনুকরণীয় ছিল। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং ব্যক্তিগত সততা ও নিষ্ঠার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তার এই সাদামাটা জীবনযাপন, দেশপ্রেম এবং সততা তাকে জনগণের কাছে ‘ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। বাবার পথেই এখন হাঁটছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে তিনি একাধিক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। কথায় বলে ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। অর্থাৎ সকাল দেখেই সারা দিন কেমন যাবে তা বোঝা যায়। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের শুরুটা ঠিক তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন দিনের সূচনা হয়েছে এমনটি অনেকে মনে করছেন।
প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ রচিত ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া : রাজনৈতিক জীবনী’ বইয়ে তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করা হয়। সেখানে তারেক রহমান বলেন, ‘আব্বু সাদাসিধে জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন। আমরাও কোনোদিন কোনো দামি জামা-কাপড়, জুতা ব্যবহার করিনি। কেউ আমাদের কোনো জিনিস দিলে আব্বু তা পছন্দ করতেন না। তিনি নিজেও কারও কাছ থেকে কোনো উপহার নিতেন না। সেজন্য আত্মীয়স্বজনরা আমাদের কোনোকিছু উপহার দিতে সাহস করতেন না। আব্বু-আম্মু আর আমরা দুই ভাই সাধারণ খাবার খেতাম। খুব সাধারণ পোশাক পরতাম। আব্বুর ব্যবহার করা প্যান্ট বা শার্ট আব্বুর ছোট-বড় হলে সেগুলো কেটে আমাদের গায়ের মাপে দর্জি জামা-প্যান্ট তৈরি করে দিত।’
১৯৮১ সালের ১২ জুন দৈনিক বাংলায় এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আনুষ্ঠানিক এবং সরকারি উপলক্ষ্যেই শুধু জিয়াউর রহমান ভালো পোশাক পরতেন। কিন্তু বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন খুবই সহজ-সরল মানুষ, এমনকি ছেঁড়া কাপড় রিপু করিয়েও পরতেন। ২০১২ সালের ২৩ জুলাই এবিএম মূসা এক সাক্ষাৎকারে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বলেন, ‘একবার জিয়া আমাকে তার সঙ্গে বঙ্গভবনে দুপুরের খাবার খেতে বললেন। খাবারের টেবিলে অপেক্ষা করছিল অপার বিস্ময়। একজন প্রেসিডেন্টের মেন্যুতে এমন সাধারণ মানের খাবার থাকতে পারে ভাবাও যায় না।’
জানা গেছে, বাবার মতোই সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাধারণ একটি সাদা শার্ট ও প্যান্ট পরে তাকে সচিবালয়ে অফিস করতে দেখা গেছে। সরকারি গাড়ি, চালক ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলাচল, প্রটোকল কমানো এবং শনিবারেও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুনত্ব আনার পাশাপাশি রাজনীতি বদলেরও ইঙ্গিত দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এসব উদ্যোগ প্রশংসিত হচ্ছে। জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতেও শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত নতুন প্রধানমন্ত্রী ব্যতিক্রমী যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন সেগুলো হচ্ছে-প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার চলাচলের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি, নিজস্ব চালক ও নিজের কেনা জ্বালানি ব্যবহার করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে আগে ১৩-১৪টি গাড়ি থাকত। জনদুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে সেই বহরে গাড়ি কমিয়ে এখন ৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় সড়কের দুই পাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান নেওয়ার সেই প্রথাও বাতিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সাধারণ চলাচলে গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জনভোগান্তি কমাতে মন্ত্রিসভার বৈঠক অধিকাংশ সময় সচিবালয়ে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে শনিবারও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান দ্বিতীয় দিনের মতো বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অফিস করেছেন। তার আগমনে দ্বিতীয় দিনেই সচিবালয়ে দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। সেখানে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। সকাল সোয়া ৯টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ ভবনের (নতুন ভবন) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি প্রবেশ করেন। রোজার প্রথম দিন হওয়ায় তখনো সব সচিব ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সচিবালয়ে এসে হাজির হননি। অথচ প্রধানমন্ত্রী তার অফিসে এসে হাজির হয়েছেন। এর ফলে সচিবালয়ে তখন যে যার কক্ষে ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে ফাইল নিয়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে ছুটে যান। যেসব সচিব তখনো কাছাকাছি রাস্তায় জ্যামে বসে ছিলেন তাদের অনেকেই গাড়ি ছেড়ে হন্যে হয়ে সচিবালয়ে ঢোকেন। এতদিন সচিবালয়ের সংস্কৃতি ছিল সকাল সাড়ে ৯টা-১০টার মধ্যে আয়েশের ভঙ্গিতে সচিব বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অফিসে আসতেন।
এরপর ধীরে-সুস্থে কাজ শুরু হতো। কিন্তু তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়ে দ্বিতীয় দিনই সেই পুরাতন রীতি ভেঙে দিলেন। তিনি নিজে সকাল ৯টার পরপরই অফিসে ঢোকেন। এর ফলে পুরো সচিবালয়ে ভিন্ন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর তৎপরতায় সচিবালয়ে যেন কাজের গতি ফিরে আসে। এর মধ্যে দুপুরে আরেক ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়। জোহরের নামাজের বিরতিতে প্রধানমন্ত্রী নিজে নামাজ আদায় করেছেন এবং তার অফিসের সবাই নামাজ পড়েছেন। বিষয়টি সচিবালয়ে সবার কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশ গঠনে দ্রুত কাজ শুরু এবং তা এগিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী শনিবারেও অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উন্মুক্ত স্থানে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এটাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যাত্রা। প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পর থেকে নিয়ম অনুযায়ী তাকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মধ্যে চলতে হবে এই নিয়মই স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসছে। প্রটোকল মানেই নিরাপত্তায় কড়াকড়ি, সাইরেন বাজিয়ে রাস্তা ফাঁকা করা, আর সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা আর ভোগান্তি। কিন্তু প্রচলিত এই ভিভিআইপি প্রটোকল নিচ্ছেন না তারেক রহমান। কারণ জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করতে তিনি চান না। তাই শপথের পর প্রথম দিনই প্রটোকলের কঠোরতা ছাড়া জনসাধারণের সঙ্গে মিশে চলাচল করার রেওয়াজ চালু করেন তিনি। এ যেন ইউরোপ বা আমেরিকার গণতান্ত্রিক কোনো দেশের দৃশ্য। সাধারণ মানুষ তার এসব কর্মকাণ্ডে বেশ খুশি বলে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে।
১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সচিবালয়ে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর রাজধানীর এক ব্যস্ত মোড়ে যানজটে আটকে পড়েছিল। আগের নিয়ম চালু থাকলে সব রাস্তা বন্ধ করে মুহূর্তেই রাস্তা ফাঁকা করে দেওয়া হতো। কিন্তু অন্য সব গাড়ির মতোই সিগন্যালে অপেক্ষা করেছে প্রধানমন্ত্রীর বহর। কোথাও অতিরিক্ত তৎপরতা নেই, নেই হর্ন বা সাইরেনের চাপ। গাড়ির কাচ নামিয়ে পথচারীদের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। অনেকেই বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ান, কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেন, কেউ আবার এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান। মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এসব দৃশ্য, যা নিয়ে শুরু হয় ইতিবাচক আলোচনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব শুধু কিছু আচরণগত পরিবর্তন নয়, বরং একটি প্রতীকী ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের বার্তা। নেতৃত্ব জনগণের ঊর্ধ্বে নয়, বরং জনগণের অংশ এটিই জনমনে স্পষ্ট করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তারেক রহমান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন-রাজনীতি, গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তিনি বহুদলীয় ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তার মাধ্যমেই বাংলাদেশে মূলত সহনশীলতা ও উৎপাদনের রাজনীতির গোড়াপত্তন হয়। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ঘোষণা করেছিলেন যা আত্মনির্ভরতা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছিল। তিনি বলেন-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছিল প্রশংসনীয়। জিয়াউর রহমান উদ্যমী হয়ে বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন এবং সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তার বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন, ‘আশার রাজনীতি’ প্রচার করে সব বাংলাদেশিকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে এবং আরও বেশি উৎপাদন করতে ক্রমাগত আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাবার পথেই দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণও ছিল এক কথায় অসাধারণ। বিশেষ করে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃচ্ছ সাধনের আহ্বান ছিল অতুলনীয়। বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না এমন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করা হবে এটি নতুন প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ প্রতিশ্রুতি। বিএনপির সংসদীয় দলের এসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শের প্রতিফলন বলেই মনে হয়।
আয়শা/২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/দুপুর ১:০৮






