কাঁচা মরিচের ঝাল কমলেও ঊর্ধ্বমুখী সবজির বাজার

Ayesha Siddika | আপডেট: ০৭ জুলাই ২০২৩ - ০২:৫১:৪৯ পিএম

ডেস্ক নিউজ : শুক্রবার (৭ জুলাই) কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, আগানগর, কালীগঞ্জ ও পুরান ঢাকার শ্যামবাজারসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই অস্থির দেশের কাঁচা মরিচের বাজার। বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ২৫ জুন থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। আমদানি অব্যাহত থাকলেও দেশের বাজারে ওঠানামা করছে এর দাম।

তবে এক দিনের ব্যবধানে মানভেদে কেজিতে ৩০ থেকে ১০০ টাকা কমে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায়। আর বৃহস্পতিবার কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছিল ৩৬০ থেকে ৪০০ টাকায়। বিক্রেতারা বলছেন, আমদানি বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে আমদানি বন্ধ হলে বা সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিলে আবারও বাড়বে দাম। সোলেয়মান নামে এক বিক্রেতা জানান,বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। তাই দাম কিছুটা নিম্নমুখী। কিন্তু বাজারে দাম ওঠানামা করছে। সকালে বিক্রি হয়েছে ৩৫০ টাকায়। আর সরবরাহ বাড়ায় এখন দাম কমে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকায়।

কেজিতে ৩০ থেকে ১০০ টাকা কমেছে কাঁচা মরিচের দাম। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

 

পাইকারি বাজারে দাম অনেক বেশি জানিয়ে রাজীব হোসেন নামে আরেক বিক্রেতা বলেন, পাইকারিতে মরিচ কিনতে হচ্ছে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায়। তাই ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি না করলে লাভ হচ্ছে না। কনক হোসাইন নামে এক বিক্রেতা বলেন,বাজারে দেশি মরিচ নেই বললেই চলে। শুধু ভারতীয় মরিচ দিয়ে চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। আমদানি আরও বাড়ালে, হয়তো সংকট কিছুটা কাটতে পারে। নয়তো দাম আবারও বাড়বে।

 

তবে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে কাঁচা মরিচের দাম ওঠানামা করছেন বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। তারা বলেন, দেশে আমদানি অব্যাহত রয়েছে। তবুও দাম বাড়ছে। এর পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট কাজ করছে। সাব্বির আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, বাজারে কাঁচা মরিচের কোনো সংকট নেই। মরিচ ঠিকই আছে। কিন্তু সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিয়ে দাম বাড়াচ্ছে বিক্রেতারা। রায়হান ইসলাম নামে আরেক ক্রেতা বলেন,আমদানির খবরে বাজারে ওঠানামা করছে মরিচের দাম। বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি না করার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ পেয়ে মুনাফা করছে। আর পকেট কাটছে ভোক্তার। এদিকে বাজারে মরিচের ঝাল কিছুটা কমলেও ঊর্ধ্বমুখী অন্যান্য সবজির বাজার। মানভেদে প্রতিটি সবজির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারে সবজি কিনছেন ক্রেতারা। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে প্রতিকেজি পটোল ৫০ টাকা, কচুর লতি ৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুমুখী ১০০ টাকা, ঢেঁড়স ৪৫ টাকা, আলু ৪০ টাকা, শসা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়েছে করলা ও টমেটোর। প্রতিকেজি করলা ১৫০ টাকা ও টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

বিক্রেতারা জানান, বৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তা ছাড়া ঈদের ছুটির পর এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি সরবরাহব্যবস্থা। এতে দাম কিছুটা চড়া। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাজারের সবজি বিক্রেতা নাঈম ইসলাম বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। পাইকারিতেও দাম বেশি। তাই কিছুটা বাড়তি দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে আসবে। আর কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করে কেরানীগঞ্জের আগানগর বাজারের বিক্রেতা মহসিন বলেন,বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। এতে ক্রেতা কমে গেছে। যারা আসছেন, তারাও পরিমাণে কম কিনছেন।

ঊর্ধ্বমুখী সবজির দাম। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

 

এদিকে ক্রেতাদের দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও শাকসবজির দাম চড়া, যা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিগগিরই এটি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, চরম বিপাকে পড়তে হবে সাধারণ মানুষকে। জয় সরকার নামে এক ক্রেতা বলেন,বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বাজার সিন্ডিকেটের কাছে ভোক্তারা এখন জিম্মি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত এ বিষয়ে নজর দেয়া।

শাকসবজির বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও স্বস্তির খবর মাংসের বাজারে। নতুন করে বাড়েনি মুরগি, গরু ও খাসির মাংসের দাম। বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, সোনালি ২৬০ টাকা ও লাল লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়। আর গরু ও খাসির মাংস যথাক্রমে বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা ও ১ হাজার টাকা কেজি।

বাজারে স্থিতিশীল রয়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

 

বিক্রেতারা জানান, চাহিদা কম থাকায় ও সরবরাহ ঠিক থাকায় নতুন করে বাড়েনি ব্রয়লার মুরগিসহ অন্যান্য মাংসের দাম। তবে দাম বেড়েছে লাল ডিমের। বিক্রি হচ্ছে ১৪৪ থেকে ১৫০ টাকায়। আর সাদা ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়। এদিকে দু-তিন দিনের ব্যবধানে বাজারে সব আদার দামই নিম্নমুখী। কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে ভিয়েতনাম, বার্মা ও ভারতীয় আদা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২৫০ টাকায়। বিক্রেতারা বলেন, আমদানি বাড়ায় দাম কমতির দিকে। এ ছাড়া আদা কাঁচামাল হওয়ায় মজুত করা সম্ভব নয়। এখানে সিন্ডিকেটের কোনো সুযোগ নেই।

বাজারে কমেছে আদার দাম। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের সুরমা বাণিজ্যালয়ের মালিক ঝুটন সাহা বলেন, বাজারে সব ধরনের আদার দামই কমেছে। মূলত একসঙ্গে অনেক আদা আমদানি হওয়ায় আড়তগুলো এখন ভরপুর। এতে কমছে দাম। পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের গ্রামবাংলা বাণিজ্যালয়ের মালিক বিপুল সাহা বলেন, আদা কাঁচামাল। মজুত করার কোনো সুযোগ নেই।

তবে ঈদের পর ঊর্ধ্বমুখী পেঁয়াজ ও রসুনের দাম। দেশি পেঁয়াজ কেজিতে ৫ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা পর্যন্ত। বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৭৫ থেকে ৮০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, ঈদের ছুটির কারণে সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যাবে যাবে। শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি পাঁচ কেজি দেশি পেঁয়াজ ৩৫০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২৩০ টাকায়।

পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে পাইকারিতে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

 

আর আড়তদারদের দাবি, পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। খুচরা ব্যবসায়ীরা আড়ত থেকে কম দামে কিনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে। পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের মিতালি আড়তের মালিক আব্দুর রহিম বলেন,আড়তগুলোতে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত আছে। কোনো সংকট নেই। আড়তে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা পাইকারি দরে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পাইকারিতে দাম নাগালের মধ্যে থাকলেও খুচরা বাজারে পাইকারি দামের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। এদিকে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে রসুনের দাম। প্রতিকেজি দেশি রসুন ২০০ টাকা, ভারতীয় রসুন ২২০ থেকে ২৪০ টাকা ও চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়।

 

ট্রাক থেকে আড়তে নেয়া হচ্ছে রসুন। ছবি: বিশ্বজিৎ দাস বিজয়

 

পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের মেসার্স রাজীব বাণিজ্য ভান্ডারের মালিক জানান, সরবরাহ কমে যাওয়ায় রসুনের দাম বাড়তি। মানভেদে রসুনের দাম আলাদা। তবে সিন্ডিকেটের কোনো সুযোগ নেই। ঊর্ধ্বমুখী মাছের বাজারও। বাজারে প্রতিকেজি দেশি মাগুর ১ হাজার ৪০০ টাকা, দেশি শিং ১ হাজার ৪০০ টাকা ও শোল ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতিকেজি টেংরা ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা, রুই ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, কাতল ৩৮০ থেকে ৪৩০ টাকা, পাবদা ৭০০ থেকে ৮০০, চিংড়ি ৯৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর আকারভেদে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায়।

ক্রেতারা জানান, বাজারে মাছের সরবরাহ থাকার পরও বেশি দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা। তাপস নামে এ ক্রেতা বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত মাছের জোগান রয়েছে। তবুও দাম বাড়তি। আর বিক্রেতারা জানান, বাজারে মাছের সরবরাহ ঠিকই আছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় কম। এতে দাম কিছুটা বাড়তি। এদিকে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের দাবি জানিয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই। ক্রেতারা বলছেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হয় না। এতে বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ পায়। আর বিক্রেতারা বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছে করে দাম বাড়াচ্ছে। বাজারে নিয়মিত অভিযান চালালে অসাধুদের দৌরাত্ম্য কমবে।

 

 

কিউটিভি/আয়শা/০৭ জুলাই ২০২৩,/দুপুর ২:৫০

▎সর্বশেষ

ad