
স্পোর্টস ডেস্ক : ২০১০ সালে ইন্টার মিলান সবশেষ ইতালিয়ান ক্লাব হিসেবে জিতেছিল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। হোসে মরিনহোর সেই ইন্টার মিলানের পর শুধু য়্যুভেন্তাস দুবার খেলেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল। আর টুর্নামেন্টটির ইতিহাসের দ্বিতীয় সফলতম দল এসি মিলান তো দীর্ঘ একটা সময় জায়গাই পায়নি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অভিজাত মঞ্চে। মালিকানা নিয়ে জটিলতা আর আর্থিক সংকটে ইতালির সবচেয়ে গ্ল্যামারাস ক্লাবটি হারিয়েই গিয়েছিল।
ইতালিয়ান ক্লাব ফুটবলে নতুন করে জীবন ফিরেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। বড় তারকারা একটু হলেও ফের ইতালিমুখী হচ্ছে। নতুন প্রতিভার উত্থান ঘটছে। দুর্দান্ত ট্যাকটিশিয়ানরা ফের দায়িত্ব নিচ্ছেন ইতালিয়ান ক্লাবের। ৯০ ও শূন্য দশকে ইউরোপের মঞ্চে রাজত্বটা ছিল ইতালিয়ান ক্লাবগুলোর হাতেই। ১৯৯০-২০০৭ সাল সময়কালের মধ্যেই চারবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিল এসি মিলান। আর ১৯৮৫-২০১০ সাল পর্যন্ত সময়কাল হিসেব করলে সিরি আ’র সেরা তিন ক্লাব মিলে ঘরে তুলেছে মোট সাতটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। অথচ ২০১০ সালের পরবর্তী ১৩ বছর একটিও শিরোপা যায়নি তাদের ঘরে।
২০২৩ সালটাকে অবশ্য ইতালিয়ান ক্লাবের উত্থানের বছর বলা যায়। গত মৌসুমে দীর্ঘ ১১ বছর পর লিগ জিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলতে এসেছে এসি মিলান। আর এ মৌসুমে সিরি আ’তে চমক দেখাচ্ছে নাপোলি। দিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতিধন্য নেপলসের ক্লাবটি দীর্ঘ ৩০ বছর পর আছে স্কুদেত্তো জেতার দ্বারপ্রান্তে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও দারুণ খেল দেখাচ্ছে ম্যারাডোনার উত্তরসূরিরা। প্রথমবারের মতো জায়গা কর এ নিয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে। এসি মিলান, ইন্টার মিলান ও নাপোলি; চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে এবার জায়গা করে নিয়েছে তিনটি ইতালিয়ান ক্লাব। গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়েছে শুধু য়্যুভেন্তাস।
ইতালিয়ান ক্লাবের জয়যাত্রা অবশ্য এখানেই থামছে না। সেমিফাইনালে নিশ্চিতভাবে একটা ইতালিয়ান ক্লাব দেখা যাবেই। কারণ কোয়ার্টার ফাইনালে যে মুখোমুখি হচ্ছে এসি মিলান ও নাপোলি। যে জিতবে উঠে যাবে সেমিফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালের ড্র বলছে একটা ইতালিয়ান দল ফাইনালের মঞ্চে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। বুধবার (১২ এপ্রিল) রাতে মুখোমুখি হচ্ছে এসি মিলান ও নাপোলি। একই দিনে রিয়াল মাদ্রিদ ও চেলসি মুখোমুখি হলেও এই ম্যাচটি নিয়ে ফুটবলপ্রেমীরা আলাদা একটা রোমান্টিসিজমে ভুগবে নিশ্চয়ই। এসি মিলান যদি ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা ফিনিক্স পাখি হয়, তবে নিঃসন্দেহে নাপোলি খেলছে স্বপ্নের ফুটবল। এই মুহূর্তে ফুটবল জগতের দারুণ সব প্রতিভা খেলছেন দুই দলে।
এসি মিলানের জেগে ওঠার পেছনে যেমন রাফায়েল লিয়াও, ব্রাহিম দিয়াজ, থিও হার্নান্দেজ, সান্দ্রো টোনালি, ইসমায়েল বেননাসেরদের অবদান অনেক। তেমনি নাপোলি উপহার দিয়েছে সময়ের ভয়ঙ্কর ডুয়ো – খাবিচা কাভ্রাৎস্খিইয়া ও ভিক্টর অসিমহেন। জর্জিয়ার ২২ বছর বয়সী তরুণ উইঙ্গার কাভ্রাৎস্খিইয়া তো এরই মধ্যে নতুন ম্যারাডোনা হিসেবে আলোড়ন তুলেছেন। আদর করে নেপলসবাসী তাকে ডাকে কাভ্রাডোনা। ম্যারাডোনা পরবর্তী সময়ে নাপোলির সম্ভাব্য প্রথম লিগ শিরোপা জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান তারই। এই অভিযানে তার সতীর্থ নাইজেরিয়ার তরুণ স্ট্রাইকার ভিক্টর অসিমহেন।
ইতালিয়ান ক্লাবের জেগে ওঠার পেছনে ক্লাবগুলোর মালিকপক্ষ ও ম্যানেজমেন্টেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য। ইউরোপের ফুটবলে আরব-আমেরিকার বিশেষ করে আরবের পেট্রো ডলারের ঝনঝনানি শুরু হওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে তারকাশূন্য হয়েছে ইতালিয়ান ক্লাবগুলো। স্পেনে রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা ছাড়া এই নতুন করে ধণী হয়ে ওঠা ক্লাবগুলোকে টেক্কা দিয়ে খেলোয়াড় ভেড়াতে পারেনি কেউই। তাই সাফল্যের খাতাও তাদেরই নাম। অন্যদিকে ইতালির ফুটবল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ আর আর্থিক মন্দায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতালি জাতীয় দলও এ সময়ে পিছিয়ে পড়েছে ঢের। ২০১৪ বিশ্বকাপের পর আর গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থের মঞ্চে দেখা যায়নি আজ্জুরিদের। ২০০৬ সালে শিরোপা জেতার পর পরের দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে তারা।
তবে সিরি আ’র ক্লাবগুলোর মালিকানায় পরিবর্তন আসার পর অবস্থার পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ২০১১ সালের পর য়্যুভেন্তাসের একচেটিয়া প্রাধান্য ভেঙে লিগের শিরোপা জিতেছে ইন্টার মিলান ও এসি মিলান। এবার তো নাপোলি বিপ্লবই ঘটিয়ে দিচ্ছে। সেরা চারে জায়গা করে নিতে দারুণ লড়াইয়ে নেমেছে ক্লাবগুলো। উঠতি তারকাদের দারুণ পারফরম্যান্সে মুখরিত হচ্ছে সিরি আ। আর এসবের নেপথ্যে কাজ করেছে ক্লাবগুলোর নতুন মালিকপক্ষের আধুনিক ধ্যানধারণা। এসি মিলান, ইন্টার মিলানসহ মোট সাতটি ক্লাবের মালিকানায় আছে বিদেশিরা। এদের পাঁচজনই যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের। বাকি দুজন কানাডা ও চীনের।
ক্লাবগুলোর খেলার দর্শনেও দেখা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। রক্ষণাত্মক ফুটবল ছেড়ে আক্রমণাত্মক ফুটবলে নাম লিখিয়েছে ইতালির ক্লাবগুলো। হার ঠেকানোর মানসিকতা ঝেরে ফেলে তারা প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বীরবিক্রমে। যার প্রমাণ মিলবে ক্লাবগুলোর গোলসংখ্যার দিকে তাকালেই। ইউরোপের ফুটবলে ইতালির পুনরুত্থান ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য দারুণ ঘটনা। একপেশে হয়ে পড়া ফুটবলে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে এতে।
কিউটিভি/আয়শা/১২ এপ্রিল ২০২৩,/রাত ৮:৪৮






