
স্পোর্টস ডেস্ক : ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পাওলো মালদিনিদের ট্রফি কেসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা আছে পাঁচটি করে। লিওনেল মেসিও চারবার এই শিরোপা ছুঁয়ে দেখেছেন। অথচ রোনালদো লিমা, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, বুফনের মতো তারকাদের ক্যারিয়ারে আক্ষেপ হয়ে থেকে গেছে একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। ক্লাব ফুটবলের এই এলিট টুর্নামেন্টে শিরোপা ছুঁয়ে দেখতে পারেনি এমন নক্ষত্রের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। প্রজন্মের সেরা তারকা হয়েও একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারেনি এমন উদাহরণও প্রচুর। তেমন কিছু হতভাগা ফুটবলারের নাম জেনে নেয়া যাক౼
রোনালদো লিমা: ফুটবল ইতিহাসের সেরা নাম্বার নাইন বলা হয় রোনালদো লিমা বা দ্য ফেনোমেননকে। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি তার ক্যারিয়ারে দুবার জিতেছেন বিশ্বকাপ শিরোপা। জিতেছেন দুটি ব্যালন ডি’অর। অথচ তার ক্যারিয়ারে আক্ষেপ হয়ে থেকে গেছে একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। পিএসভি, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান। রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলানের মতো ক্লাবে খেলেও এই অপূর্ণতা ঘোচাতে পারেননি বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। অবশ্য ১৯৯৮ সালে ইন্টার মিলানের হয়ে উয়েফা কাপ ও ১৯৯৭ সালে বার্সেলোনার হয়ে উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ জয় করেছিলেন ‘আসল’ রোনালদো।
রবার্তো ব্যাজ্জিও: ইতালির ফাইনেস্ট ফুটবলার হিসেবে খ্যাত রবার্তো ব্যাজ্জিওর ক্যারিয়ারের হাইলাইটস হয়ে আছে ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস। অথচ ফুটবলার হিসেবে দারুণ সফল ছিলেন ব্যাজ্জিও। একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা হয়তো তার বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিসের বেদনায় কিছুটা উপশম দিতে পারত। কিন্তু এই শিরোপাও অধরা থেকে গেছে দ্য ডিভাইন পনিটেইলখ্যাত এ তারকার। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়টা তিনি কাটান য়্যুভেন্তাসে। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি তুরিনের বুড়িদের ডেরা ছাড়েন। আর কষ্টের বিষয়, সে মৌসুমেই আয়াক্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতে য়্যুভেন্তাস।
ডেনিশ বার্গক্যাম্প: আয়াক্সকে বলা হয় প্রতিভার খনি। এই ডাচ ক্লাবের অন্যতম সেরা প্রতিভাও কখনো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ছুঁয়ে দেখতে পারেননি। আয়াক্স থেকে ইন্টার মিলান ঘুরে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনালে। ২০০৩ সালের ‘দ্য ইনভিন্সিবল’ খ্যাত অপরাজেয় লিগ জেতা আর্সেনালের অন্যতম রূপকার ছিলেন এই ডাচ ফুটবলার। ইন্টার মিলান ও আয়াক্সের হয়ে উয়েফা কাপ জিতেছেন তিনি। আর্সেনালের হয়ে প্রিমিয়ার লিগে দারুণ সাফল্য পেলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সফল হচ্ছিল না আর্সেনাল। অবশেষে ২০০৬ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ওঠে আর্সেনাল। কিন্তু বার্সেলোনার সঙ্গে হেরে যাওয়া ফাইনালে মাঠেই ছিলেন না তিনি। আর্সেনাল ক্যারিয়ারে সেটাই হতে পারত তার শেষ ম্যাচ। ভাগ্যে থাকলে শিরোপা ছুঁয়েই বিদায় নিতে পারতেন ‘নন-ফ্ল্যাইং ডাচম্যান’।
এরিক ক্যান্টনা: ম্যানচেস্টার ইউনাটেডের ৯০ দশকের প্রথম হিরো হিসেবে বিবেচনা করা হয় এরিক ক্যান্টনাকে। আইকনিক ৭ নাম্বার জার্সি গায়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিজেকে আলাদা এক অবস্থানে নিয়ে যান কিং এরিক। ১৯৯২ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চালু হলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রথম পাঁচ মৌসুমে চারবার এই লিগ জেতে। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের তখনো এলিট পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি রেড ডেভিলরা। ক্যান্টনার সেরা সুযোগ এসেছিল ১৯৯৭ সালের আসরে। সেবার তারা সেমিফাইনালে হারে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে। যারা সে আসরে টুর্নামেন্টটির শিরোপা জিতে নেয়।
মাইকেল বালাক: এই জার্মানকে বলা চলে ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগা ফুটবলার। ক্যারিয়ারে ফাইনাল হারায় বালাকের ধারেকাছে কেউ নেই। ২০১-০২ মৌসুমে তার দল বেয়ার লেভারকুসেন বুন্দেস লিগায় শেষ তিন ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট হারিয়ে লিগ হারে। অতঃপর জার্মান কাপে ৪-২ ব্যবধানে শালকের বিপক্ষে হেরে রানার্সআপ হয়। শুধু তাই নয়, সেবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে জিদানের দারুণ ভলিতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও ফাইনালে হারে বালাকের লেভারকুসেন। সেই অভিশপ্ত মৌসুমের শেষটা হয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে হারে। বালাকের সামনে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের সুযোগ আবার আসে ২০০৭-০৮ মৌসুমে। চেলসির হয়ে সেবার শেষ ম্যাচে লিগ হাতছাড়া করেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে। এরপর টটেনহ্যামের বিপক্ষে হেরে এফএ কাপের শিরোপাও হারান। ২০০২ সালের পুনরাবৃত্তি যেন ২০০৮ সালেও হয় তার ক্যারিয়ারে। এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে চেলসি টাইব্রেকারে হারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে। সে মৌসুমের শেষ ধাক্কাটা আসে ইউরোর ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হেরে।
জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ: তার প্রজন্মের সেরা স্ট্রাইকারদের একজন হয়েও ইব্রাহিমোভিচ কখনোই ছুঁয়ে দেখাতে পারেননি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। বালাকের মতো এই সুইডিশকেও যেন তাড়া করছে কোন এক অভিশাপ। তাই ভুরিভুরি গোল করে লিগ জয় করলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এলিট শিরোপা তার হাতে ধরা দেয়নি। উল্টো তিনি ক্লাব ছড়লেই যেন সেই ক্লাবের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ভাগ্য খুলে যায়। ২০০৯ সালে ইন্টার মিলান ছাড়ার পরের বছরেই তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যেতে। একই ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে যখন তিনি বার্সেলোনা ছাড়েন। টুর্নামেন্টটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় সেরা দশ গোলদাতার মধ্যে শুধু তার ও নিস্টেলরয়েরই জেতা হয়নি এই শিরোপা। ক্যারিয়ারে আয়াক্স, বার্সেলোনা, ইন্টার মিলান, য়্যুভেন্তাস, এসি মিলান, পিএসজি, ম্যানইউয়ের মতো ক্লাবে খেলেও ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি তার।
জিয়ানলুইগি বুফন: ২০০৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক বুফনের ক্যারিয়ারেও অপ্রাপ্তি হিসেবে রয়ে গেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। য়্যুভেন্তাসের হয়ে ক্যারিয়ারে তিনবার টুর্নামেন্টটির ফাইনালে খেলে একবারও ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হয়নি সর্বকালের অন্যতম সেরা এই গোলরক্ষকের।
ফ্রান্সেস্কো টট্টি: রোমের অষ্টম সম্রাট খ্যাত টট্টিরও বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য হলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ছুঁয়ে দেখা হয়নি। এএস রোমার হয়ে গোটা ক্যারিয়ার কাটিয়ে দেওয়া টট্টি একবার স্কুদেত্তো জিতলেও কখনোই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তেমন কিছু করে দেখাতে পারেননি। তার সময়ে রোমার সেরা সাফল্য দুবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা।
পাভেল নেদভেদ: চেক প্রজাতন্ত্রের এই মিডফিল্ডার সিরি ‘আ’তে ল্যাজিও ও য়্যুভেন্তাসের হয়ে স্কুদেত্তো জিতেছেন। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই মিডফিল্ডার তার ক্যারিয়ারে পেয়েছেন ব্যালন ডি’অরের স্বাদও। কিন্তু কখনোই তার ছুঁয়ে দেখা হয়নি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। ২০০৩ সালে তুরিনের বুড়িদের হয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন বটে কিন্তু ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেও তারা হেরে যায় এসি মিলানের কাছে। অবশ্য সাসপেনশনের জন্য ফাইনালে বেঞ্চে বসেই দলের হার দেখতে হয় তাকে।
রুদ ভ্যান নিস্টেলরয়: এই লিস্টে নিস্টেলরয়ের নামটা দেখা দুর্ভাগ্যজনক। ৫৬ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ গোলদাতা এই ডাচ। এমনকি টুর্নামেন্টটির তিন আসরে তার চেয়ে বেশি গোল করতে পারেনি আর কোন ফুটবলার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগটা অধরা থেকে গেছে তার।
কিউটিভি/আয়শা/২৫.০৫.২০২২ খ্রিস্টাব্দ/সন্ধ্যা ৬:০৮






