রুপা মোজাম্মেল এর জীবনালেখ্যঃ বাবা

superadmin | আপডেট: ৩১ মে ২০২২ - ১০:০৯:৫০ পিএম

বাবা
——
সুঠাম দেহের অধিকারী উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত, খুবই পরিপাটি, চুল ব্যাক ব্রাশ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা আর খুবই শান্ত স্বভাবের আমার আব্বু। গায়ের কাপড়ে কখনো কোনো কুচকানো দাগ দেখিনি বা জুতো কখনো পলিশ ছাড়া পড়তে দেখিনি। সব সময় চেষ্টা করেছেন নবীর সুন্নাত অনুসারে চলতে। পেশায় তিনি একজন ব্যাংক ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছিলেন। জীবনে কখনো কোনো লোন নেননি, বলতেন লোন নিয়ে মরে গেলে সেই বোঝা সন্তানদের উপর আসবে আর তিনি জাহান্নামের আগুনে জ্বলবেন। খুবই সাধারণ জীবন যাপন করেছি আমরা।

প্রতিদিন অফিস যাওয়ার আগে নিজের কাপড় আয়রন আর জুতো পলিশ করা ছিল আব্বুর প্রথম কাজ। আমাদের বলতেন “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ”।

নিজের কাপড় সবসময় নিজের হাতে ধুয়ে আয়রন করে রাখতেন। বলতেন “নিজের কাজ নিজে করা সুন্নাত”।

আমরা পাঁচ ভাইবোন। বোনদের মধ্যে আমি ছোট, আর আমার ছোট দুই ভাই। বাবা মা নিয়ে এক এক ভাইবোনের এক এক রকম স্মৃতি। আজকে আমি একটু আমার অংশের স্মৃতিচারণ করছি।

আমি একটু বেশি আব্বু ঘেঁষা ছিলাম, তাই আব্বুর সব কিছুতে আমার নজর থাকতো একটু বেশি। অফিস যাওয়ার সময় আব্বুর রেডি হওয়া দেখতে খুব ভাল লাগতো! বাসা থেকে বের হবার পর যত দুর দেখা যেতো, তাকিয়েই থাকতাম! সেটা এক অন্যরকম ভালোলাগা ছিল।

শুক্রবার ছিল সবচেয়ে প্রিয় একটা দিন! সকাল সকাল নাস্তা খেয়ে বাজার করতে বেরিয়ে যেতেনআব্বু। অপেক্ষায় থাকতাম কখন আব্বু আসবেন! কারণ আজকে আব্বু বাজার থেকে সবার জন্য মজার মজার জিনিষ আনবে, বাদাম কটকটি, মুরালি, নিমকি আর নয়তো গুড়ের সন্দেশ। অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকতাম কখন আব্বু আসবে!

একবার আব্বু গেঞ্জি পড়লেন, আমি বললাম আব্বু গেঞ্জি উল্টা পড়েছেন! উত্তরে বললেন খুললেই সোজা হয়ে যাবে, কালকে তাহলে সোজাটা পড়তে পারবো। আব্বু প্রায় সময়ই এটা করতেন, জানি না ইচ্ছে করেই করে কিনা, কিন্তু আমারও বেশ মজা লাগতো। এই উল্টা সোজা খেলা চলেছে অনেক বছর। আমার বিয়ের পরও যখন বাসায় আসতাম একই জিনিষ করতেন আমার সামনে, উল্টা গেঞ্জি পরে ঘুরতেন আর আমিও মনে করাতাম “আব্বু গেঞ্জি উল্টা”। আব্বুও একই উত্তর দিয়ে মিট মিট করে হাসতেন।

আব্বু আমাদের কতটা ভালোবাসতেন কখনো বুঝতে পারতাম না। মাঝে মাঝে ভাবতাম আমাদের হয়তো ভালই বাসে না, কারণ আব্বু জড়িয়ে ধরে অন্য সব বাবাদের মত আদর করে না।

অফিস থেকে এসেই প্রথমে আব্বু নিরবে দেখতেন আমরা পাঁচ ভাইবোন বাসায় আছি কিনা। যে কোনো ভাইবোন কোনো কারণে খালাদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে রাত থাকলেই আব্বু অস্থির হয়ে যেতেন। তখন আব্বুর অবস্থা দেখে বুঝতাম একটু একটু ভালোবাসে আমাদের!

আব্বুর পাশে খেতে বসলে সব সময় মাছের বড় টুকরো বা মাছের মাথাটা আমার পাতে তুলে দিতেন, বুঝতাম আব্বু একটু বেশিই ভালোবাসে আমাকে!

একবার আব্বুর সাথে শপিং এ গিয়েছি, বাসায় আসার সময় রিক্সা থেকে পড়ে যাই, আর হাঁটু কেটে অনেক রক্ত বের হয়, হাতের সব ব্যাগ ছুড়ে ফেলে আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়। জিনিষ পত্র রাস্তা থেকে কুড়িয়ে অন্য মানুষ জন বাসায় দিয়ে গিয়েছে। সেদিন আব্বুর অবস্থা দেখে বুঝেছি, আমাকে অনেক ভালোবাসে আব্বু!

আলমারিতে কখনোই কাপড় রাখতেন না আব্বু। একটা সুটকেস ছিল, সেখানে কাপড়, আব্বুর অন্যান্য দরকারি জিনিষ পত্রের সাথে টাকা পয়সা সব ঐ সুটকেসেই থাকতো। আর সুটকেসটা থাকতো খাটের নিচে। সেটার চাবী আম্মা জীবনেও খুঁজে পায়নি। কিন্তু সেই চাবী আব্বু আমার কাছে রাখতে দিতেন! আব্বুর সবচেয়ে বিশ্বস্তের মানুষ হতে পেরে নিজের উপর খুব গর্ব হতো!

শেষ দেখা ছিল আব্বুর সাথে ২০০৩ এ, যখন আমাকে বিদায় দিতে এসেছিলেন বিমান বন্দরে।

দেশ ছাড়ার সাত মাস পরই আব্বু চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

বাবা তুমি কোথায়?
ঐ তারারা আছে যেথায়!
বাবা তুমি আসবে না আর ফিরে?
কত স্মৃতি রয়েছে তোমায় ঘিরে!

 

লেখিকাঃ রুপা মোজাম্মেল। কানাডা প্রবাসী। দেশে লেখাপড়া শেষ করে কানাডায় বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কোর্স শেষ করেছেন। সেখানেই তাঁর কর্ম জীবন। লেখালেখি করেন নিয়মিত। প্রয়াত বাবাকে নিয়ে তাঁর আজকের লেখাটি সকলের বুকের মাঝে হাহাকার সৃষ্টি করবে নিশ্চয়ই। লেখিকা রুপা এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বাঁধভাঙা জোয়ারের নোনা পানির মত চোখের জল ঝরিয়েছেন অনেক। আমরা না হয় তার অশ্রুসিক্ত লেখাটি পড়ে তাঁর বাবার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আল্লাহ যেন তাঁর বাবাকে বেহেস্ত নসিব করেন। আমিন।

 

কিউএনবি/বিপুল/৩১.০৫.২০২২ খ্রিস্টাব্দ/ রাত ৯.৫৬

▎সর্বশেষ

ad