সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন ছিলেন গণতন্ত্র ও স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষে

admin | আপডেট: ০১ জানুয়ারী ২০২২ - ০৭:১৯:৪৪ পিএম

ডেস্কনিউজঃ ‘বরেণ্য সাংবাদিক নেতা ও সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ আমৃত্যু গণতন্ত্র এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। জীবনের শেষদিকে এসে দেশের বর্তমান ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থায় তিনি মনোকষ্টে ছিলেন। তার মৃত্যুতে দেশ একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিককে হারালো না, সাংবাদিকরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানবাধিকার ও স্বাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা জনানো সম্ভব।’

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক নাগরিক শোকসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) এ শোকসভার আয়োজন করে।

বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং ডিইউজে’র সাংগঠনিক সম্পাদক দিদারুল আলম দিদারের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএফইউজে ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ, বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম ও সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনু, বিএনপি নেতা ও সাবেক ডাকসুর জিএস খায়রুল কবীর খোকন, জামায়াতে ইসলামীর প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, বিএফইউজের মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন, সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ, সিনিয়র ফটো সাংবাদিক রফিকুর রহমান, ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক মো: শহিদুল ইসলাম, ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাকের হোসাইন ও জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, ফটোজার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুদ্দিন নূরু, বিএফইউজের নির্বাহী পরিষদ সদস্য এ কে এম মহসীন, ডিইউজের সহ-সভাপতি বাছির জামাল ও রাশেদুল হক প্রমুখ।

শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন বিএফইউজের সহ-সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন। সভা শেষে দোয়া পরিচালনা করেন মাওলানা এ কে এম আশরাফুল হক।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরেণ্য সাংবাদিক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের কর্মময় জীবন স্মরণ করে বলেন, বিভিন্ন সময় জাতির সংকটময় মুহূর্তে তিনি অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে নব্বইয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দালনে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে তার মতো একজন দায়িত্বশীল, পরিশীলিত ও সাহসী মানুষের বড়ই প্রয়োজন। রিয়াজ ভাই পথ দেখিয়েছেন- কিভাবে সংকট মোকাবেলা করতে হয়।

নতুন বছরে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন- উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, একটা দানবীয় ভয়াবহ সরকার বুকের ওপর চেপে বসে আছে। সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী, স্বাধীনতার প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, সময় এতোটা খারাপ যাচ্ছে যে, টিকে থাকাই কঠিন। তবে মানুষ জেগে উঠেছে। বিভিন্ন কর্মসূচির সফলতা আমাদের আশা জাগিয়েছে। আমরা সকলে যদি সাহসের সঙ্গে ওঠে দাঁড়াতে পারি, তাহলে এই দানবীয় সরকারকে সরাতে পারবো।

এ সময় তিনি মরহুম রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন তিনি।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যারা সবসময় সত্যের পক্ষে কথা বলতে পারেন- রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সেরকম মানুষ। তার মতো মানুষ বর্তমানে বিরল। এ প্রসঙ্গে তিনি একজন বক্তার বক্তব্য পুনরুল্লেখ করে বলেন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মন্ত্রি-এমপি হবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে শুধু সাংবাদিক থাকতে চেয়েছিলেন। অথচ বর্তমানে সর্বত্র মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখতে পাই। ২০১৮ সালে ভোটের আগের রাতে ডাকাতি করে ক্ষমতায় বসে আছে। তারা নির্বিচারে সত্যের অপলাপ করে চলেছে। তবে তাদের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে। রিয়াজ ভাই সেই বিজয় দেখে যেতে পারেননি।

বিএফইউজে ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন অগ্রভাগের সৈনিক। তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। সাংবাদিকতা ছিল তার প্রাণ। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়েই তিনি জনগণের পক্ষে কথা বলেছেন।

সাংবাদিকদের আন্দোলনে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের বিভিন্ন সময়ের সাহসী ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ দেশ, জীবনধর্মী ও গণতন্ত্রবাদী সাংবাদিকতার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার (রিয়াজ উদ্দিন) লেখা একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘বারবার গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের ফসল জনগণ পাচ্ছে না।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, যারা দেশকে ভালোবাসতেন, জাতীয়তাবাদী ঘরানার পরিচিত ছিলেন- বর্তমান দুঃসময়ে তারা একে একে চলে যাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিবিসির সাংবাদিক সিরাজুর রহমান, শিক্ষাবিদ ড. পিয়াস করিম। সর্বশেষ চলে গেলেন রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। দুঃসহ স্বৈরশাসন মানসিক চাপ সৃষ্টি করে বলেই তারা অসময়ে চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তিনি ছিলেন ধ্রুপদী আর আধুনিক চরিত্রের সমাহার। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এর থেকে উত্তরণে সাংবাদিকদের ভূমিকার উপর গুরুত্বারোপ করেন রিজভী। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা কলম ও কণ্ঠ অব্যাহত রাখলেই রিয়াজ ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে।

বিএনপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্ত গণমাধ্যম ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সকলকে সোচ্চার হবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা এখন হীরক রাজার দেশে বাস করছি। মিথ্যে বলা ছাড়া এখানে কেউ টিকে থাকতে পারে না। নিশিরাতের সরকার সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাম্প্রতিক বিবৃতির কঠোর সমালোচনা করেন।

সভাপতির বক্তব্যে বিএফইউজের সভাপতি এম আবদুল্লাহ বলেন, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে সাংবাদিকরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার লড়াই সাহসের সঙ্গে চালিয়ে যেতে পারলেই রিয়াজ ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ দেশে সাংবাদিকতা প্রসারে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের ভূমিকা স্মরণ করে বলেন, সাংবাদিকতাকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন সফল। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন মুক্তমনের দেশপ্রেমিক। যারা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, রিয়াজ ভাই লেখনীর মাধ্যমে তাদের অনুপ্রেরণা দিতেন।

বিএফইউজের মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন বলেন, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছিল রিয়াজ ভাইয়ের চাওয়া। নব্বইয়ে স্বৈরাচার পতন ত্বরান্বিত করতে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের আদর্শ বাস্তবায়নে আরো বেশি আত্মনিয়োগ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বিএফইউজের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ পেশা ও ইউনিয়ন কাজে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের সাথে ৪৩ বছরের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে বলেন, রিয়াজ ভাই ছিলেন অসীম সহ্যের মানুষ। কঠিন কথা বললেও কখনো তাকে রাগ হতে দেখিনি। তিনি উদার গণতান্ত্রিক ছিলেন। ইউনিয়নকে কখনও রাজনৈতিক আবর্তে জড়াননি। ইউনিয়নকে পেশাজীবী ইউনিয়ন হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

ডিইউজের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী বলেন, বিভক্ত ফোরাম ও বিভক্ত ইউনিয়নের নেতা হয়েও রিয়াজ ভাই ছিলেন সবার নেতা। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি যেমন ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন, তেমনি বর্তমান ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনেও তিনি থাকতেন সামনের সারিতে। তার মৃত্যু সংবাদপত্র এবং রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি।

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান শেষ জীবনে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের মনোকষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরা নিয়ে রিয়াজ ভাইয়ের প্রবল আক্ষেপ দেখা গেছে।

ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, রিয়াজ ভাই গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন করে গেছেন, তা অব্যাহত রাখতে হবে।

বিপুল/১লা জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ |সন্ধ্যা ৭:১৬

▎সর্বশেষ

ad