
ডেস্ক নিউজ :বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১৮ সালের পর অন্যতম আলোচিত তরুণ মুখ নুরুল হক নুর। জেন-জি প্রজন্ম যাকে চেনে ভিপি নুর নামে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামা এই ছাত্রনেতা কীভাবে বারবার নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে পৌঁছালেন-এই গল্পটাও এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকের মুখে মুখে।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান নুরুল হক নুর। তখন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম নেতা হিসেবে রাজপথে নামতেই শুরু হয় হামলা, মামলা আর মারধর। স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন) কার্যত সরকারের পেটুয়া বাহিনী হিসেবে কাজ করত। তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত হন নুর।
সে সময় পত্রিকার পাতা, টেলিভিশনের স্ক্রিন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ত নুরের রক্তাক্ত মুখ। রাজনৈতিক মহলে তখন থেকেই চালু হয়ে যায় একটি কথা …মার খেতে খেতে নেতা নুর।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের আগের দিনগুলোতেও রাজপথে ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নুরের ভূমিকা নিয়ে এখনো আলোচনা হয়। সেই সময় তার একটি বক্তব্য ব্যাপক ভাইরাল হয়, আর একটু ধাক্কা দিলেই পতন হবে হাসিনার। শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তবে রূপ নেয়।
২০১৯ সালে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ে চমক দেখান নুরুল হক নুর। মূলধারার ছাত্ররাজনীতির বাইরে থেকেও বিশাল ভোটে জয় এনে দেন তিনি। এখান থেকেই জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে প্রবেশ নুরের।
কিন্তু ভিপি হওয়ার পরও থেমে যাননি। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠে থাকায় একের পর এক হামলার শিকার হন। এমনকি স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পরও গত বছর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় সংঘর্ষে তার মুখ থেকে বুক পর্যন্ত রক্তাক্ত হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফেটে যায় নাক। স্ট্রেচারে করে হাসপাতালে নিতে হয় তাকে।
১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নে জন্ম নুরের। বাবা ইদ্রিস হাওলাদার, মা মরহুম নিলুফা বেগম। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। স্থানীয় স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর গাজীপুর বিজয় সরণি স্কুলে ভর্তি হন। এসএসসি উত্তরা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন।
২০২১ সালে তিনি গঠন করেন নাগরিক অধিকার পরিষদ। পরে সেটিই রূপ নেয় বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ট্রাক প্রতীকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পায় দলটি। তখন থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান তৈরি করেন নুরুল হক নুর।
রাজনীতির ভাষায় যাকে বলে গ্রাসরুট লিডারশিপ। নুর ঠিক সেই জায়গা থেকেই উঠে এসেছেন। গ্রামের আটপৌরে জীবন, ঢাবির রাজপথ, রক্তাক্ত আন্দোলন। সব মিলিয়ে তার গল্পটা অনেকটা সিনেমার নায়কের মতোই। পার্থক্য শুধু একটাই। এই গল্পটা বাস্তব।
আর ২০২৬ সালে এসে সেই রাজপথের নেতা পৌঁছে গেলেন সংসদে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি জোটের সমর্থনে ট্রাক প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বড় ব্যবধানে জয়ী হন তিনি। নিজ এলাকায় প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েই বিজয় ছিনিয়ে নেন সাবেক ডাকসু ভিপি।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচন, ২০২১ সালে দল গঠন, ২০২৪ সালে নিবন্ধন আর ২০২৬ সালে সংসদ-এই আট বছরে নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক পথচলা ছিল রক্তাক্ত রাজপথ আর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের গল্প।
অনিমা/১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৯:০৫






