”বাবলু আমার বন্ধু”

superadmin | আপডেট: ০২ জুন ২০২২ - ১২:৩০:৩২ এএম

”বাবলু আমার বন্ধু”
———————
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বর্ষপূর্তিতে সকল ছাএ/ছাএীদেরকে প্রিয় প্রাঙ্গনের জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

আজকের দিনে প্রাণভরে মনে করছি বন্ধু বাবলুকে, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং আমাদের বিভাগের গর্ব !! বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে মাহবুবুল হক বাবলু’র নাম স্বর্নাক্ষরে লিখা থাকবে চিরদিন !! আমাদের গর্ব ,আমাদের ভালবাসার বন্ধু বাবলু !! আমার কাছে বাবলু শুধুমাত্র সহপাঠি, একমাত্র এটাই বড় পরিচয় !!

আমি -মাহবুবা আহমেদ (স্বপ্না )
দর্শন বিভাগ
১৯৮০- ৮১শিক্ষা বর্ষ
রোকেয়া হলের আবাসিক ছাএী
কক্ষ নং – Ex 30
এবং
মেইন বিল্ডিং – ৭
আমার দীর্ঘদিনের আবাসস্থল ছিলো !!

জীবনকে দেখা শুরু হয়েছিলো এই জায়গা থেকে। অর্জন বলতে এই পরিচয়টাই গর্বের সাথে বলতে ভালবাসি, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাএী !!
প্রথম যখন ক্লাশ শুরু করি খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম ! এত বড় পরিসর, এত ছেলেমেয়ে এক সাথে ! এত নাম করা লোকজন ! দেশ যারা চালায় প্রায় সবই এখান থেকে পাশ করা ! প্রাচ্যের অক্সফোর্ড যার পরিচয়, কি অসাধারন বিশ্ববিদ্যালয়, আমি তার ছাএী,কি গর্বের !কি ভালবাসার !!

প্রথম বর্ষ, সব নতুন ! সব অপরিচিত ! অসহায় লাগে !! ক্লাশ শেষে সবাই ডিপার্টমেন্টের করিডোরে এসে নিজেদের কাজ নিয়ে কথাবার্তা বলা .. পরিচিত হওয়া, গল্প করা, সেমিনারে কাজ করা, অফিসের কাজ থাকলে সে সব করে, হলে চলে যাওয়া, আমাদের নিত্যদিনের রুটিন !!

কোএডুকেশনে কখনও পড়ি নাই। ছেলেদের সাথে সহজে মিশতে পারবো বলে ও মনে হয় না। কতযে দ্বিধাদন্ধ, সংকোচ মনে নিয়ে দিন কাটে !!

ক্লাশ শেষে প্রায়দিন একটা ছেলে মিষ্টি হেসে অল্প সল্প কথা বলে !! বেশ ভদ্র, আন্তরিক বলেই মনে হতে লাগলো !! বেশ কিছু সময় ও চলে গেছে ইতোমধ্যে মোটামুটি পরিচয় হয়ে গেলো ছেলেটার সাথে, নাম তার “বাবলু“ !!

আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে নীচে নামতেই এক গাঁদা ছেলে বসে থাকে গেটের সামনে লাইন ধরে !! কি যে অস্বস্তি লাগে, একা একা ওদের সামনে দিয়ে হেটে যেতে হয় ! একেবারেই ভালো লাগে না একা একা হলে যাওয়া, এই অপছন্দের কাজটার জন্য সব সময় কাউ কে খোঁজ করতাম, হলে পৌছে দিয়ে আসার জন্য !! এই বদঅভ্যাসটা আমার শেষ দিনটি পর্যন্ত্য ছিলো !!

একদিন কাউকে না পেয়ে, বাবলু কে বললাম, আমাকে একটু হলে পৌছে দিয়ে আসবা ?? স্বহাস্যে বাবলু বললো, চলো !!
আস্তে আস্তে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো !! কাজ শেষে নিজেই বলে : হলে যাবা, চলো !!

আমি খুবই বোকাসোকা মানুষ ! ক্লাশ আর হলের বাইরে আমার কোন জীবন নেই ! পুরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কখনও হাকিমের চা খাওয়া, মধুর ক্যান্টিনে যাওয়া, লাইব্রেরির সামনে বসে গল্প করা বা ভাষা ইন্সটিটিউশনের সামনে বসা, এই মজার কাজ গুলি করা হয় নাই !! জানি না কেন যেন হয় নাই !!!

লম্বা ফর্সা, সেন্ডেল পরা, সাধারন বেশ ভুষার মিষ্টি ভাষী বন্ধু “বাবলু “ আমাকে স্বযত্নে হলে পৌছে দিয়ে শামসুন্নাহার হলে যলে যায় ওর প্রিয়জনের কাছে, প্রায়ই চলে এই নিয়ম !!

অতি সাধারন ভাবে কথা বলে, কোন অহংকার নেই, অনেকেই ডাকে কিন্ত আমি সাথে থাকলে অন্যকারো সাথে কথা বলে না, মনে মনে ভাবি কি ভদ্র আমার বন্ধুটা। ও যদি রাস্তায় কথা বলা শুরু করতো আমি একা কি একটা বিব্রতকর অবস্থায় দাডিয়ে থাকতে হতো … কত বুঝে, মেয়েদের সম্মান দিতে জানে !!!

একদিন পরিচিত এক ছেলে বললো, তোমাকে বাবলুর সাথে দেখলাম !
আমি : হ্যা, ওতো আমার ক্লাশমেট !!
ছেলে : জানো ও কত বড় নেতা ?
আমি : মানে কি ? নেতা আবার কি ?
ছেলে: তুমি জানো না ‘বাবলু ‘তো বিএনপি‘র বড় নেতা !! ওরা দুই ভাই। অন্য জন ‘নীরু’ সে ও রাজনীতি করে !
আমি : নীরু কি করে ?
ছেলে : এক সাথে পড়ে
আমি : কখনও তো দেখি নাই
আমি : আকাশ থেকে পরলাম !!
জানার আগ্রহ বাড়লো, অন্য সহপাঠিদের থেকে জানলাম।

পুরা বাংলাদেশ কাঁপানে ছাত্র দলের তুখোড় নেতা সহদোর ”নীরু- বাবলু” !! সেই বাবলু,যে আমাকে হলে পৌছে দেয়!!

ওর চালচলন,কথাবার্তায় এক মূহুর্তের জন্যও বুঝি নাই এত বড়নেতার সাথে হাটছি !! বন্ধু যদি নেতা হয় তখন কি এমনই হয়, হয় না !! সব বন্ধুতো আর এত বড় হৃদয়ের মানুষ হয় না !!

একদিন বিকালে হলের গেটে অন্যবন্ধুদের সাথে একটা নতুন ছেলে, আগে কখনও দেখি নাই ,বেশ কেতা দুরস্তর পোষাক- আশাক, কেড্স পরা, ইন করা সার্ট, হাল্কা পাতলা গড়ন একটু আধুনিক !!
বন্ধুরা পরিচয় করিয়ে দিলো, নীরু ! চিনো ওঁকে ?
আমি : দেখি নাই !!
নীরুও আমাদের সহপাঠি ছিলো কিন্ত, কখন ও দেখিছি বলে মনে হয় নাই !! দুই ভাইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের মিল থাকলেও বাহ্যিক কোন মিল খুঁজে পেলাম না !! দুই ভাইয়ে কে দুই প্রকিতির দুজন মনে হলো !!

সমাজ সংসার দুটাই চলে রাজনীতিতে, কিন্ত এতে আমার কোন বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই !! আমার মনে হতো যারা রাজনীতি করে তারা আমাদের মতো সাধারন মানুষ নয় !! দেখতে সাধারন হলেও আসলে তারা এলিয়েন। না হলে কি করে এত মানুষের মন জোগায়ে চলে ?

যে সব রাজনীতিবিদের কে চিনি তাদেরকে রাজনীতিবিদ ভাবতে পারি না, ব্যক্তিগত পরিচয়টাকেই বেশী প্রাধান্য দেই !! রাজনীতিতে অনাগ্রহ আমার চিরদিনের কিন্ত অতি কাছ থেকে দেখা এই দুই ভাই আমার কাছে বিস্ময় !!

লোক মুখে না শুনলে হয়ত কোনদিন জানা হতো না,বাবলু কত বড়নেতা ছিলো। কিন্ত ওঁর আচরনে কখনও প্রকাশ পায় নাই !! কত ক্ষমতাবান দুই ভাই ছিলো, তখন বুঝি নাই !! এখন অনুধাবন করতে পারি !! গর্বিত হই বিশাল হৃদয়ের দুই ভাইয়ের সহপাঠি হিসাবে !! বিশাল ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা বাবলু কে চিনি নাই। আমি তো চিনতাম আমার সহপাঠি সদালাপী বাবলু কে !! আমার কাছে মহান বন্ধু বাবলু !!

রাজনীতিবিদরা ও রাজনীতির বাইরে যেতে পারে , সাধারন করে কথা বলতে পারে,এত অল্প বয়সে এত ক্ষমতা, ওর মাথা নষ্ট করে দেয় নাই !!
এত বছর পর ওঁর কথা লিখতে যেয়ে মন প্রাণ ভিজে যাচ্ছে !
আমার দেখা অরাজনৈতিক বাবলু !
যার কথা মনে হলে স্মৃতিকাতর হয়ে পরি !! এখন ও কানে বাজে বাবলুর কথাগুলো।

 

লেখিকাঃ মাহবুবা আলম স্বপ্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক ছাত্রী। আমেরিকায় সেটল্ড করেছেন। আপন সহোদর কিংবদন্তীর ছাত্রনেতা শহীদ মাহবুবুল হক বাবলু ও সানাউল হক নীরুর ক্লাসমেট, বান্ধবী ছিলেন মাহবুবা আলম স্বপ্না। মাঝে মাঝে তাঁর আবেগময়ী লেখা ফেসবুকে পাঠকদের মাঝে হাহাকার সৃষ্টি করে। তাঁর প্রয়াত বন্ধু মাহবুবুল হক বাবলুকে নিয়ে তাঁর আজকের লেখাটি এমন হাহাকার সৃষ্টি করা এক লেখা। তাঁর ফেসবুক থেকে লেখাটি সংগৃহিত।

 

কিউএনবি/বিপুল/০২.০৫.২০২২ খ্রিস্টাব্দ/ রাত ১২.১৫

▎সর্বশেষ

ad