ব্যাংককের সকল বাংলাদেশীদের কাছে খুব দ্রুত খবরটা পৌঁছে গেল। ব্যাংককে নীরু তার সকল দলবল নিয়ে পালিয়ে এসেছে। ফাওরাতে উঠেছে। কিন্তু কথাটা আংশিক সত্য। নীরু ভাই ব্যাংককে আসেনি। বড়ভাই সহ আমরা এসেছি। প্রথমে আমরা ৬ জন ব্যাংককে এসেছি। সাঈদ সোহরাব, অশোক আর আমি ব্যাংককে এসেছি প্রথমেই ।
দ্বিতীয় দফায় আসলো বড়ভাই, সজল ও জুয়েল। সজল ও জুয়েল সরাসরি তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর দিয়ে থাই এয়ারলাইন্সে ব্যাংককে চলে আসে। বড় ভাই আসেন ঢাকা থেকে সড়ক পথে কলকাতায়। বিনা পাসপোর্টে। সদর স্ট্রিটে এস্টোরিয়া হোটেলের শহীদ ভাই বড়ভাইকে একটা বাংলাদেশী পাসপোর্ট সংগ্রহ করে দেন। বড়ভাই কলকাতা থেকে ব্যাংককে আসেন বাদশা আলম নামের এক পাসপোর্ট নিয়ে।
১৯৯১ সালের ২৭শে অকটোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনে এক বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়। ক্যাম্পাসের আধিপত্য তখন ইলিয়াস আলীর হাতে। বিএনপি ক্ষমতায়। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে ইলিয়াস গ্ৰুপ সেদিন মারদাঙ্গা ভূমিকায় অবতীর্ন হয়। রোকেয়া হলের বিপরীতে অবস্থান নেয় ইলিয়াস গ্ৰুপ। অপরদিকে প্রতিপক্ষরা অবস্থান নেয় রোকেয়া হলের ভিতর। দুইপক্ষের মধ্যে প্রায় এক হাজার রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। ইলিয়াস গ্ৰুপের প্রতিপক্ষরা রোকেয়া হলের দেয়ালকে ঢাল বানিয়ে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থান থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দু ঘন্টাব্যাপী এ সম্মুখ বন্দুক যুদ্ধে প্রাণ হারায় ইলিয়াস গ্ৰুপের মির্জা গালিব ও লিটন। এই হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে বড়ভাইর পক্ষে আর ক্যাম্পাস বা দেশে থাকা সম্ভব হয়না। তিনি কোলকাতা হয়ে ব্যাংকক চলে আসেন।
ইসতিয়াক আহমেদ দুলাল ভাইর অফিস কাম দোকান ফাওরাতে। ছোট্ট একটি কাচ ঘেরা সে দোকান। বান্টি ফটোপ্রিন্ট। ফাওরাতের ৪৫৬ চাককাপেট রোডে ছোট্ট এই দোকান থেকে জরুরী ছবি তোলা, লোকাল, এসটিডি ও আইএসডি ফোন কল করা যেত। মানি এক্সচেঞ্জ হয় এখানে।
দোকান ছোট হলেও ব্যবসা জমজমাট। আমরা শিয়া ব্যান খায়েক এর বাসা থেকে সকালবেলা ফাওরাতে চলে আসি। সকালের নাস্তা এখানে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট মিতালীতে অথবা নেপালী রেস্টুরেন্ট এ সেরে নেই। এরপরে ব্যাংককের প্রচন্ড তাপদাহে আমাদের আশ্রয় মিলে শীতাতপ বান্টি ফটো প্রিন্ট এ। বরুন কুমার শ্রীকুমার ওরফে বান্টি হল দুলাল ভাইর ছেলে। ওর নামেই দোকানের নামকরণ। দুলাল ভাইর স্ত্রী নীলম কুমারী শ্রীকুমার ইন্ডিয়ান থাই। অসম্ভব একজন ভালমানুষ। ফাওরাতে গুরু দুয়ারা নানকশাহী মন্দিরে ফুড সাপ্লাই এর ব্যবসায় নীলম ভাবীর পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা আছে।
আমাদের আড্ডা, আমাদের আশ্রয় স্থল বান্টিতে। নাস্তা খাওয়ার পর লাঞ্চ পর্যন্ত এ আড্ডা চলে। কখনো ক্লান্তি মনে হলে বান্টির অপজিটে এটিএম মার্কেটে আমরা আড্ডা দিতে যাই। চারতলায় ফুডকোর্টে সিঙ্গারা কফি খাই। আবার ফিরে আসি বান্টিতে। বান্টির সম্মুখে শতশত বাংলাদেশী মুখ। আমরা বান্টির কাঁচ ঘেরা ঘরে বসে থাকি, বাইরে উৎসুক শত বাংলাদেশী মুখ আমাদেরকে দেখে। আমরা যেন চিড়িয়াখানার আজব এক জীব। সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী আলোচিত, সমালোচিত এই মুখগুলো এখন ব্যাংককে ছোট্ট একটি কাঁচ ঘেরা ঘরে বন্দি। বাতাসের গতিবেগকে দুর্দমনীয় দুঃসাহসের সঙ্গে থামিয়ে দেয়া এই সকল যুব প্রাণ এখন চিড়িয়াখানার দর্শনীয় জীবের মত।
দুলাল ভাই আমাদের সঙ্গ দেয়। দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলে। আমাদের অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে সাহস যোগায়। জিন্দেগী এক লম্বি সফর। এই সফরে সাহসের সঙ্গে লড়াই এর পরামর্শ দেয়। দুপুরে আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করি। মিতালী রেস্টুরেন্ট এর মালিক বাচ্চু ভাইয়ের থাই স্ত্রী কাউন্টারে বসে থাকে। মাঝে মাঝে বিদঘুটে গলায় বাচ্চু ভাইয়ের স্ত্রী চিৎকার করে হোটেল বয় ইয়াসিনকে অর্ডার করে, চা ডুইডা। থাই মুখে বাংলা শব্দ দুইটা কি করে ”ডুইডা” হল এ নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি।
আমাদের জীবন থমকে গেছে ফাওরাতে। সাঈদ সোহরাব মাঝে মাঝে হাওয়া হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেল পাইসানিকাং এ সেন্ট্রাল জিপিওর সামনে মমতাজ গেস্ট হাউজে দুজন বন্ধু জুটিয়েছে সে । এদের একজন ধানমন্ডির আলম ও জাপান ফেরত ওয়াহিদুজ্জামান ওরফে বিটুসান। বড়ভাই আসার পর সজল জুয়েল ফাওরাতের ওয়েলকাম হোটেলে উঠল। একদিক দিয়ে ভালোই হল। ফাওরাতে আড্ডা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আমরা বড়ভাই, সজল জুয়েলের রুমে যেয়ে রেস্ট নিতাম।
আমাদের সময় কাটে অখন্ড অবসরে। ঘুঘু ডাকা দুপুর কাটে স্মৃতির পাতায়। ফেলে আসা দেশ, ফেলে আসা রাজনীতি, ফেলে আসা অতীত আমাদেরকে আনমনা করে তুলে। পুরো ৮০ দশকটা লড়াই করেছি আমরা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। এরশাদের পতন ঘটিয়েছি। কিন্তু যে মুহূর্তে নিজ দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসলো ঠিক তখনি ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আমাদেরকে দেশ ছাড়তে হল। প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। আমরা তাঁর পক্ষের মানুষ ছিলাম। তাঁর কাছে পরাপর্শের জন্যে গেলে তিনি বললেন, গুলি খেয়ে মরে যাওয়া অথবা জেলে যাওয়া কোনোটাই লাভজনক নয়। অতএব তোমরা ভাগো, দেশ ছাড়।
বান্টির একটু পুবে বিশাল এক পাকা নালা,ড্রেন। শহরের সকল বর্জ্য পানি এই নালা দিয়ে রিসাইক্লিং হয়ে ফ্রেশ পানিরুপে চাওফিয়া নদীতে চলে যায়। এই নালা বা ড্রেনের পাশে হাই স্টেকের জুয়া খেলা চলে। মোটা মোটা স্বর্ণের চেইন পরে থাই ধনীর দুলালরা এখানে জুয়া খেলে। এদের জুয়া খেলার পাশে ফ্রিজ আকারের একটি যন্ত্র আছে। এটাকে গানের বাক্স বলা হত। বাক্সটার বুকে প্রায় ১০০টি বাটন আছে। বাটনের নীচে গানের কলি লেখা থাকতো। এক থাই বাথ এর কয়েন পুশ করলে একটা গান শোনা যেত। আবার একেবারেই ১০ টি কয়েন দিয়ে একই গানের বাটনে ক্লিক করলে পরপর ১০ বার একই গান শোনা যেত। আমরা একেবারেই ১০/২০ বাথ এর কয়েন পুশ করে রিচার্ড মার্ক্স্ এর এই জনপ্রিয় গানটি শুনতাম। সারা ফাওরাতে রিচার্ড মার্ক্স্ তখন কেঁদে কেঁদে এই গানটি গাইত ।
Oceans apart day after day
And I slowly go insane
I hear your voice on the line
But it doesn’t stop the pain
If I see you next to never
How can we say forever
Wherever you go
Whatever you do
I will be right here waiting for you
Whatever it takes
Or how my heart breaks
I will be right here waiting for you.
একই গান বারবার শুনতে শুনতে জুয়াড়ি থাই ধনীর ছেলেরা বিরক্ত হয়, ক্ষেপে যায়। এই গানের যন্ত্রটি মূলত তাদের টাকায় কেনা। কিন্তু মেশিনে একাধিক বারের কয়েন পুশ করা হয়েছে। তাদের করণীয় কিছু নেই। অসহ্য হয়ে একদিন তারা গালাগালি শুরু করল। হিয়া, বাংলাদেতি হিয়া, তোদের কাম নেই। সারাদিন একগান বাজাও। আমরাও পাল্টা গালি দেই। বানচোত। ওদের কেউ কেউ আমাদের গালি না বুঝে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে, এলাই ? ফুট মাইডি ? আমরা বলি, নো নো, খারাপ কথা নয়। বানচোতমানে ” আই লাভ ইউ”। পরে এমন অবস্থা হল, থাই যুবকেদের দেখলেই আমরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠতাম,বানচোত, আই লাভ ইউ।
ছবি পরিচিতিঃ ১. ব্যস্তময় ব্যাংককের ডাউনটাউন ফাওরাত। ২. ব্যাংকক জীবনের উপাখ্যান পর্ব কাহিনীর লেখক লুৎফর রহমান। ৩. জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাবির সূর্যসেন হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম মির্জা মাসুদ খান জুয়েল। ৪. জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাবির জগন্নাথ হল শাখার সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক অশোক কুমার অনল।
লেখকঃ লেখকঃ লুৎফর রহমান। লেখক, কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ।
বিপুল/৮ই এপ্রিল, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | সন্ধ্যা ৭:৪৮