
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : প্রায় চার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মধ্য গাজার আল-আকসা হাসপাতালে প্লাস্টিকের বোতলে করে পানি আনতে হয় মোহাম্মদ আল শান্তিকে। এই পানি শুধুমাত্র তার পরিবারের মৌলিক ও জরুরি সব প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়।
“আমরা আমাদের জামাকাপড় ধুই না, আমরা পানির প্রতিটি ছোট ফোঁটা সংরক্ষণ করি,” এভাবেই বার্তাসংস্থা সিএনএনকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত অবরুদ্ধ গাজার পানি সরবরাহে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির বর্ণনা করেন মোহাম্মদ আল শান্তি।
গত সাত অক্টোবরের হামাস ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পুরো গাজা ভূখণ্ড জুড়ে অবরোধ ঘোষণা করে পানি, বিদ্যুৎ, খাবার এমনকি জ্বালানির মত গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। এমন অবস্থায় বেশীরভাগ গাজাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি খোঁজা একটি ক্রমবর্ধমান কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় তিনটি পাইপলাইনের একটি দিয়ে সামান্য পানি সরবরাহের অনুমতি দিয়েছে ইসরায়েল। যা অঞ্চলটির চাহিদার সামান্য বলছেন যদিও গাজার বেশির ভাগ পানি আসে স্থানীয় উৎস থেকে, কিন্তু পাম্প এবং পরিশোধন কেন্দ্র প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে বন্ধ রয়েছে।
ফলে ভেঙে পড়েছে গাজার পানির সরবরাহের ব্যবস্থা, এতে করে বেশীরভাগ গাজাবাসী নোংরা এবং সাগরের পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে করে অঞ্চলটিতে পানি বাহিত রোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সংকটের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাসিন্দাদের পানিশূন্যতা থেকে মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়েছে বহুগুণ।
একটি ‘মানবিক বিপর্যয়’
প্যালেস্টাইন ওয়াটার অথরিটি (পিডব্লিউএ) এর বরাত দিয়ে ১৭ অক্টোবর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ জানায় যে, গাজায় পানির উৎপাদন বর্তমানে স্বাভাবিক মাত্রার ৫ শতাংশ।
অর্থাৎ গাজাবাসীরা এখন দৈনিক ৩ লিটারেরও কম পানি দিয়ে রান্নাবান্না সহ দৈনিক জীবনযাপন করছে। যেখানে প্রতিদিন একটি পরিবারে বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয় ৫০ লিটার।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের একজন সিনিয়র ফেলো নাতাশা হল বলেন, “ফিলিস্তিনিদের কাছে বর্তমানে একমাত্র পানি মূলত নর্দমা মিশ্রিত অপানীয় সাগরের পানি। অক্সফাম বলছে, কিছু গাজাবাসী খামারের কূপ থেকে পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন।
যদিও চলতি সপ্তাহের শুরুতে যখন মিশরের সীমান্ত রাফাহ ক্রসিং দিয়ে পানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রীর ত্রাণবাহী ট্রাক দক্ষিণ গাজায় প্রবেশ করেছিল তখন আশার ঝলক দেখা গিয়েছিল গাজাবাসীর মধ্যে।
তবে শনিবার গাজা মাত্র ৬০,০০০ লিটার পানি পেয়েছে। যেখানে এই ছিটমহলে বসবাসকারী ২৩ লাখ মানুষের প্রতিদিন নূন্যতম ৩৩ মিলিয়ন লিটার পানির প্রয়োজন হয়।
জ্বালানিই যেখানে পানি
মিসর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকৃত অত্যাবশ্যকীয় ত্রাণের মধ্যে অনুপস্থিত জ্বালানী।
“জ্বালানিই হল পানি” বলেছেন সিএসআইএসের হল অফ ৷ তিনি বলেন, জ্বালানি বন্ধ করা মানে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
এমনকি পানি পানযোগ্য করাও জ্বালানির ওপর নির্ভর করে।
কিন্তু গাজাবাসীদের জন্য, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি নেই মানে পানির কল শুকিয়ে গেছে। এমনকি যদি আপনি ভাগ্যবান হন এবং একটি কূপ থাকে, আপনি সেখান থেকে পানি পাম্প করতে পারবেন না কারণ আমাদের বিদ্যুৎ নেই। বলেন আল শান্তি।
গাজাবাসীরা পানির পাত্র ভরার জন্য যে পানির ট্রাকগুলির উপর নির্ভর করে তার মধ্যে অনেকগুলি মানুষের বাড়িতে পৌঁছতে অক্ষম কারণ তাদের জ্বালানীর অভাব এবং বোমাবর্ষণ ও অন্যতম কারণ বলে জানান গাজা-ভিত্তিক স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্যালথিঙ্ক ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ওমর শাবান।
গাজার পাঁচটি বর্জ্য পানি শোধনাগার এবং তিনটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে দুটি কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। ছিটমহলের শেষ অবশিষ্ট প্রধান ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট , যা প্রায় এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ছিল, শনিবার থেকে আবার কাজ শুরু করেছে তবে এটি তার স্বাভাবিক ক্ষমতার সাত ভাগেরও কম। যদিও কিছু ছোট ডিস্যালিনেশন ইউনিট চালু আছে, এগুলো স্থানীয় এবং পর্যাপ্ত নয়।
এমন অবস্থায় গাজায় পানিবাহিত রোগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পয়ঃনিষ্কাশন রাস্তায় জমা হচ্ছে এবং বাস্তুচ্যুত গাজাবাসীরা আশ্রয়কেন্দ্রে ভিড় করছে যেখানে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন নেই। আর তাই বিশেষজ্ঞরা কলেরা এবং আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তারের আশঙ্কা করছেন, যা ইতিমধ্যেই ধসের প্রান্তে থাকা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পিপারকর্ন জানান, “হাসপাতালগুলি পানি এবং স্যানিটেশন সংকটের সম্মুখীন। কারও কারও কাছে এত কম পানি রয়েছে যে তারা অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করতে লড়াই করছে।“
গাজা উপত্যকায় বসবাসকারীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির অ্যাক্সেস দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪০-বর্গ-মাইল অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলির মধ্যে একটি।
গাজায় পানির তিনটি প্রধান উৎস রয়েছে: ডিস্যালিনেশন প্লান্ট, পাইপলাইন যা ইসরায়েল থেকে কেনা পানি বহন করে এবং ভূগর্ভস্থ কূপ।
গাজার বেশির ভাগ পানি আসে উপকূলীয় একুইফার থেকে, ভূগর্ভস্থ পানির একটি অংশ যা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উপকূলরেখা বরাবর মিশরের সিনাই উপদ্বীপ থেকে ইসরায়েল পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু এর প্রায় ৯৭ ভাগ পানি পান করার অযোগ্য। এটি নোনতা, লোনা এবং অপরিশোধিত বর্জ্য এবং দূষণ দ্বারা দূষিত।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে জ্বালানি ছাড়া নিরাপদ পানীয় ফুরিয়ে যাবে। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর কমিশনার জেনারেল ফিলিপ লাজারিনি বলেন, “মানুষ মারাত্মক পানিশূন্যতায় মারা যাবে, তাদের মধ্যে ছোট শিশুও রয়েছে।“
কিউটিভি/অনিমা/২৫ অক্টোবর ২০২৩,/দুপুর ২:৫৩






