রোজা ফরজ হওয়ার ঘোষণাসহ যা পড়া হবে প্রথম তারাবিহতে

khurshed | আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ - ০৮:২৪:৫৪ পিএম

ডেস্ক নিউজ : রমজানের প্রথম তারাবিহতে যখন ইমাম সাহেব সূরা আল-ফাতিহা থেকে শুরু করে সূরা আল-বাকারা-এর ২০৩ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করেন, তখন এক বিশাল দাওয়াত সামনে আসে—হিদায়াত, তাকওয়া, ইবাদত, কিবলার ঐক্য, রোজা, হজ, জিকির—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। প্রথম রাতেই মুমিন উপলব্ধি করেন—এই কুরআন কেবল তিলাওয়াতের জন্য নয়; এটি জীবন গঠনের সংবিধান।

আজ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ১৪৪৭ হিজরির শাবান মাসের ২৯ তারিখ। বাংলাদেশের আকাশে আজ চাঁদ দেখা গেছে, আজ এশার নামাজের পরই শুরু হবে তারাবিহ নামাজ। আজকের প্রথম তারাবিহতে হাফেজে কুরআন ইমামদের কুরআন তেলাওয়াতে মুখরিত হয়ে ওঠবে পাড়া, মহল্লা, গ্রাম কিংবা শহরের মসজিদগুলো। আজকের তারাবিহতে সুরা ফাতিহাসহ সুরা বাকারার ২০৩নং আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করা হবে। এ অংশে আলোচিত হবে—

১. আল্লাহর প্রশংসা, রবুবিয়্যাত ও দয়ার ঘোষণা (ফাতিহা)

২. হিদায়াতের দোয়া—সিরাতুল মুস্তাকিম

৩. কুরআন হিদায়াতের কিতাব—মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য

৪. কাফিরদের অবস্থান ও পরিণতি

৫. মুনাফিকদের চরিত্রচিত্রণ

৬. মানবসৃষ্টির সূচনা ও আদম (আ.)-এর ঘটনা

৭. ইবলিসের অবাধ্যতা ও শয়তানের শত্রুতা

৮. বনি ইসরাইলের প্রতি নিয়ামত ও তাদের অবাধ্যতা

৯. কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ ও তার তাৎপর্য

১০. উম্মতে মুহাম্মাদির দায়িত্ব—‘উম্মাতান ওয়াসাতা’

১১. ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা

১২. শহীদদের মর্যাদা

১৩. সাফা-মারওয়ার তাৎপর্য

১৪. রোজা ফরজ হওয়া ও তাকওয়ার শিক্ষা

১৫. দোয়ার গুরুত্ব—আল্লাহ নিকটবর্তী

১৬. জিহাদ ও ন্যায়সংগ্রামের নীতিমালা

১৭. হজ ও উমরার বিধান

১৮. আল্লাহর জিকির ও তাকওয়ার নির্দেশ (২:২০০–২০৩)

আজকের তারাবিহতে রোজা ফরজ হওয়া ও তাকওয়ার শিক্ষা সূরা আল-বাকারা ১৮৩–১৮৭ আয়াতের আলোকে দীর্ঘ আলোচনা তিলাওয়াত হবে। এসম্পর্কিত কিছু বয়ান সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

রমজান মুসলিম জীবনের এক মহিমান্বিত প্রশিক্ষণকাল। এ মাসে ফরজ রোজা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়ার পথে অগ্রযাত্রা। কুরআনে রোজার বিধান ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ তাআলা এর লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাহলো—তাকওয়া অর্জন করা। তাই রোজা ও তাকওয়া একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

রোজা ফরজ হওয়ার ঘোষণা ও উদ্দেশ্য

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৩)

এ আয়াতে তিনটি বিষয় সুস্পষ্ট করা হয়েছে—

১. রোজা পূর্ববর্তী উম্মতের ওপরও ফরজ ছিল।

২. এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান।

৩. এর মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন।

তাকওয়া কী?

তাকওয়া শব্দের অর্থ—আল্লাহভীতি, আত্মসংযম, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সচেতন চেষ্টা। তাকওয়া এমন এক অন্তর্দৃষ্টি, যা মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্যে আল্লাহর আনুগত্যে পরিচালিত করে। রোজা মানুষকে শেখায়—কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। তাই ক্ষুধা-তৃষ্ণা দমন করে যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ মানে, তার অন্তরে তাকওয়ার বীজ অঙ্কুরিত হয়।

রমজান: কুরআনের মাস

আল্লাহ তাআলা বলেন—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ

‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে—মানবজাতির জন্য হিদায়াত, সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৫)

রোজা ও কুরআনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। রোজা মানুষকে আত্মিকভাবে প্রস্তুত করে, আর কুরআন সেই আত্মাকে হিদায়াতের আলো দেয়। তাকওয়ার পূর্ণতা অর্জনে কুরআনের দিকনির্দেশ অপরিহার্য।

রোজা ও দোয়ার সংযোগ

রোজার আয়াতের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা তাঁর নৈকট্যের ঘোষণা দিয়েছেন—

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ

‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে—আমি তো নিকটবর্তী। যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৮৬)

এ আয়াত প্রমাণ করে—রোজা শুধু সংযম নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ।

হাদিসে রোজার মর্যাদা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

‘যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ৩৮, মুসলিম ৭৬০)

আরও একটি হাদিসে এসেছে—

الصِّيَامُ جُنَّةٌ

‘রোজা ঢালস্বরূপ।’ (বুখারি ১৮৯৪, মুসলিম ১১৫১)

অর্থাৎ রোজা মানুষকে গুনাহ ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে।

রোজা যেভাবে তাকওয়া গড়ে তোলে

১. আত্মসংযমের শিক্ষা – ক্ষুধা ও কামনা দমন।

২. গোপন ইবাদতের চর্চা – আল্লাহর জন্য একান্ত আমল।

৩. সহানুভূতির বিকাশ – অভাবীদের কষ্ট উপলব্ধি।

৪. শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা – সেহরি ও ইফতারের নিয়ম মানা।

৫. গুনাহ থেকে দূরে থাকা – শুধু খাবার নয়, চোখ-জিহ্বা-অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযত রাখা।

রোজা কেবল মাসব্যাপী একটি আচার নয়; এটি তাকওয়ার বিদ্যালয়। ক্ষুধা-তৃষ্ণার সংযমের মধ্য দিয়ে মানুষ শিখে—আল্লাহর সন্তুষ্টিই জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। কুরআনের আলো, দোয়ার শক্তি ও আত্মসংযমের অনুশীলনের মাধ্যমে রোজা একজন মুমিনকে পরিশুদ্ধ, সচেতন ও আল্লাহভীরু বান্দায় পরিণত করে।

প্রথম রমজানের তারাবিহ

রমজানের প্রথম রোজার প্রথম তারাবিহ-এর আজকের পঠিত অংশে আলোচিত বিষয়গুলো বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো —

সুরা ফাতেহা

এ সুরাটি কুরআনুল কারিমের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম সুরা। এ সুরাটি শুধু মাত্র তারাবিহ নামাজের প্রথম দিন তেলাওয়াত করা হবে এমন নয়; বরং সব নামাজের প্রত্যেক রাকাতেই তেলাওয়াত করতে হয়।

উম্মুল কুরআন খ্যাত ‘সুরা ফাতেহা’। এটি মক্কায় নাজিল হয়। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৭। এ সুরাটি কুরআনুল কারিমের সর্বোত্তম দোয়াও বটে। এ সুরাটি দুই অংশে ভাগ করা। প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহ পরিচয় এবং প্রশংসা রয়েছে। ৪র্থ আয়াতে আল্লাহর এবং বান্দার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। আর শেষাংশে আল্লাহ তাআলার কাছে তারই শিখানো ভাষায় পরকালের সফলতা লাভে সঠিক পথের সন্ধ্যান লাভের আবেদন রয়েছে।

সুরা বাকারা

কুরআনুল কারিমের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় সুরার নাম ‘সুরা আল-বাকারা’। এটা মাদানি সুরা। সুরাটির আয়াত সংখ্যা ২৮৬। রুকু সংখ্যা ৪০। আজ এ সুরার ২০৩নং আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে।

সুরা বাকারা শুরুতেই আল্লাহ তাআলা সমগ্র কুরআনকে ইমানদার মানুষের জন্য হেদায়েত গ্রন্থ হিসেবে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। অতঃপর মানুষের ইমানে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অতঃপর এ সুরায় তিন শ্রেণীর মানুষের আলোচনা করা হয়েছে। তারা হলো- যথাক্রমে ইমানদার, কাফের এবং মুনাফিক। সুরা বাকারার ২০৩নং আয়াত পর্যন্ত যে সব বিষয়গুলো পঠিত হবে, তা সংক্ষেপে তার বিবরণ তুলে ধরা হলো—

আয়াত ১-২০

মুত্তাকিদের পথনির্দেশিকা, সফলতা ও পরিচয়ের পর কাফেরদের পরিচয় এবং মুনাফিকের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।

আয়াত ২১-২৯

সমগ্র মানবজাতির প্রতি ইবাদাতের আহ্বান করা হয়েছে। কুরআনের প্রতি সন্দেহপোষণকারীদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। মুমিনদের জন্য জান্নাতের বর্ণনার পাশাপাশি আল্লাহর অবাধ্যকারী কাফের-ফাসেকদের ক্ষতিগ্রস্তের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

আয়াত ৩০-৩৯

হজরত আদম (আ.)-এর খেলাফত এবং মানুষের জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনা করা হয়েছে। হজরত আদম (আ.)কে মর্যাদা ও সম্মান প্রদান এবং তাকে দুনিয়া প্রেরণপূর্বক মানুষকে আল্লাহর প্রতিনিধি নির্ধারণ করেন। শয়তানের দুশমনি ও কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষায় তাওবার শিক্ষা প্রদান।

আয়াত ৪০-৭৪

ইয়াহুদিদের ইতিহাস ও মুসলমানদের দুঃখ, দুর্দশা ও তার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহর দ্বীন জমিনে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এবং অকৃতজ্ঞ ইয়াহুদি জাতির হঠকারিতার বর্ণনাসহ সুরা নামকরণে ঐতিহাসিক গরু জবেহের ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে।

আয়াত ৭৫-৯৮

ইয়াহুদিদের হেদায়েতে তৎকালীন সময়ের মুমিনদের অবস্থার বর্ণনা করা হয়েছে। বনি ইসরাঈলের ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচার, ইয়াহুদিদের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, বিশ্বনবির সঙ্গে ইয়াহুদিদের প্রতারণা, পরকালের সফলতা লাভে ইয়াহুদিদের কুট কৌশলের মিথ্যা প্রচারণা, হজরত জিবরিল (আ.) ও বিশ্বনবি (সা.)-এর সঙ্গে শত্রুতা পোষণের বিষয়টিও ওঠে এসেছে।

আয়াত ৯৯-১০৩

এ আয়াতে বিশ্বনবি (সা.)-এর প্রতি কুরাআন নাজিল এবং তার সত্যয়ন করা হয়েছে। আবার নিরূপায় অভিশপ্ত ইয়াহুদি জাতির জাদু বিদ্যা বা জাদু প্রীতির প্রতি ঝুঁকে পড়ার বিষয়টিও ওঠে এসেছে।

আয়াত ১০৪-১২৩

এ আয়াত গুলোতে ইয়াহুদিদের শিষ্টাচার বর্হিভূত আচরণ, কুরআনের আয়াত রহিত সম্পর্কিত ব্যাখ্যা, ইয়াহুদিদের ষড়যন্ত্র, মুসলমানদের চেতনাবোধকে জাগ্রত করা, শ্রেষ্ঠত্ব ও মুক্তিপ্রাপ্ত দল হিসেবে ইয়াহুদি ও নাসারাদের মধ্যে কলহ ও গলাবাজি, ইয়াহুদি-খ্রিস্টান পরস্পরের ঝগড়া বিষয়গুলো ওঠে এসেছে।

আবার মসজিদে আল-আকসা থেকে কেবলা পরিবর্তনে ইয়াহুদিদের অপপ্রচার, ইয়াহুদি-খ্রিস্টান-মুশরিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের পর নির্ভেজাল তাওহিদের ঘোষণা এবং অন্যদের সঙ্গে ইমানের সবচেয়ে বড় আদর্শিক সংঘাতের বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত ১২৪-১৪১

হজরত ইবরাহিম (আ.) মুসলমানদের ইমাম এবং কাবা ঘর নির্মাণসহ কাবা ঘর সুন্দরভাবে নির্মাণ ও শেষনবি প্রেরণের দোয়া বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর বংশধরদের আলোচনাও রয়েছে।

আয়াত ১৪২-১৫৭

পবিত্র কেবলা পরিবর্তনের রহস্য আলোচনা, মুসলিম জাতির গুণ ও পরিচয় এবং অমুসলিমদের কার্যাবলীর বিবরণের পাশাপাশি বিশ্বনবির নবুয়ত ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের সঠিক ধারণা ও প্রাসঙ্গিকতা বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর ধৈর্য ও নামাজ দ্বারা আল্লাহর সাহায্য লাভ, ইমানের অগ্নিপরীক্ষা ও শহিদের মর্যাদার বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।

আয়াত ১৫৮-১৭৭

হজ ও ওমরা পালনে আল্লাহর নির্দশন সাফা ও মারওয়া প্রদক্ষিণের বিষয়টি সুস্পষ্ট করা হয়েছে। সত্য গোপনকারী অবিশ্বাসী নেতাদের ভয়াবহ পরিণতি ও হুশিয়ারি, তাওহিদের মূলনীতি, ইমানি চিন্তাধারা, হালাল-হারাম সম্পর্কিত কুরআনি নীতিমালাসহ পূর্ব পুরুষদের অন্ধ অনুকরণের কুপ্রভাব ত্যাগ করে ইবাদত-বন্দেগিতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করা নির্দেশ এসেছে।

আয়াত ১৭৮-১৮২

ইসলামে কিসাস বা হত্যার শাস্তির বিধান, মুক্তিপণের আলোচনা রয়েছে। মৃতব্যক্তির অসিয়তের বিধান, রোজা বিধান, শিক্ষা ও তাৎপর্যসহ সেহরি খাওয়ার বিধান, ই’তিকাফের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভোগ ও তার বিধান আলোচনার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে বান্দার সাহায্য কামনার বিষয়টিও ওঠে এসেছে।

আয়াত ১৮৩–১৮৭

রোজা ফরজ হওয়া ও তাকওয়ার শিক্ষা আলোচিত হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। রোজা রাখতে অপারগ, মুসাফির, অসুস্থদের বিধান ও ফিদইয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে এ আয়াতগুলোতে। সংক্ষেপে রোজার বিধানের কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো—

কুরআনুল কারিমের ধারাবাহিক আলোচনায় সুরা বাকারার ১৮৩নং আয়াতে রোজা ফরজ হওয়ার বিধান ওঠে এসেছে। ইসলামের অন্যান্য বিধানের মতো রোজাও পর্যায়ক্রমে ফরজ হয়েছে। প্রথমদিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে প্রতি মাসে মাত্র তিন দিন রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন রমজানের এ রোজা ফরজ ছিল না।

দ্বিতীয় হিজরিতে আরবি ক্যালেন্ডারের রমজান মাসজুড়ে রোজা পালনের নির্দেশ সর্ম্পকিত আয়াতটি নাজিল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

‘হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেভাবে তোমাদের আগের লোকদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছিল। আশা করা যায়, তোমরা আল্লাহভীতি বা পরহেজগারী অর্জন করতে পারবে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)

রোজার এ বিধান দেওয়ার আগে মুসলমানদের জন্য মাসে তিনদিন রোজা রাখা আবশ্যক ছিল। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা বিধান নাজিল করেন যে, রমজান মাসজুড়ে রোজা রাখা ফরজ।

এ আয়াতের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, শুধু তোমাদের ওপরই রোজা ফরজ করা হয়নি বরং তোমাদের আগে যারা দুনিয়াতে অন্যান্য নবি-রাসুলের সময়ে তাদের অনুসারি ছিল, তাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।

অতঃপর আয়াতের শেষাংশে রোজা পালনের মহান উদ্দেশ্যের কথাও তুলে ধরেন। যদি তোমরা রোজাকে যথাযথ হক আদায় করে পালন করতে পার ‘আশা করা যায়, তোমরা তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় অর্জন করতে পারবে।’ অর্থাৎ যারা রোজা পালন করবেন তারাই তাকওয়া বা পরহেজগারী অর্জন করবেন।

এ রোজা হজরত আদম (আ.)-এর সময় থেকেই প্রবর্তিত এবং প্রচলিত রয়েছে। মানব জীবনকে পূতঃপবিত্র করে গড়ে তোলার অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা হলো রমজানের রোজা পালন।

আল্লাহর নির্দেশ পালনে রমজানের রোজা পালনের কারণেই তিনি বান্দার জন্য রহমতের দ্বারসমুহকে উন্মুক্ত করে দেন। হাদিসে পাকে প্রিয়নবি ঘোষণা করেন-

إِذَا جَاءَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ، وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ

‘রমজান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারি ১৮৯৯, মুসলিম১০৭৯)

আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি রোজার বিধান জোর-জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেননি। তিনি অনেকের জন্যই রোজার বিধানকে হালকা করেছেন। যারা রোজা বিধান পালন করতে সক্ষম নয় তাদের জন্যও দিয়েছেন বিধান। রমজানের রোজা পালনে অপারগ ব্যক্তিদের করণীয় ও বিধান উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন-

اَیَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ كَانَ مِنۡكُمۡ مَّرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ ؕ وَ عَلَی الَّذِیۡنَ یُطِیۡقُوۡنَهٗ فِدۡیَۃٌ طَعَامُ مِسۡكِیۡنٍ ؕ فَمَنۡ تَطَوَّعَ خَیۡرًا فَهُوَ خَیۡرٌ لَّهٗ ؕ وَ اَنۡ تَصُوۡمُوۡا خَیۡرٌ لَّكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ

‘(রোজা ফরজ করা হয়েছে) কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য। (তারপরও) কেউ যদি সে (দিনগুলোতে) অসুস্থ হয়ে যায় কিং কেউ যদি (তখন) সফরে থাকে, সে ব্যক্তি সমপরিমাণ দিনের রোজা (সুস্থ হয়ে অথবা সফর থেকে ফিরে এসে) আদায় করে নেবে। (এরপরও) যাদের ওপর (রোজা) একান্ত কষ্টকর হবে, তাদের জন্য এর বিনিময়ে ফিদিয়া থাকবে। (এবং তা হচ্ছে) একজন গরিব ব্যক্তিকে (তৃপ্তিসহ) খাবার দেওয়া। অবশ্য যদি কেউ (এর চেয়ে বেশি দিয়ে) ভালো কাজ করতে চায়, তাহলে এ (অতিরিক্ত) কাজ তার জন্যে হবে একান্ত কল্যাণকর। তবে (এ সময়) তোমরা যদি রোজা রাখতে পারো তা হবে তোমাদের জন্য ভালো। তোমরা যদি রোজার উপকারিতা সম্পর্কে জানতে (যে, কী পরিমাণ কল্যাণ রয়েছে!)।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৪)

উল্লেখিত আয়াতে একান্তই যারা রোজা পালনে সক্ষম নয়, তাদের বিষয়েও আল্লাহ তাআলা এ বিধি বর্ণনা করেছেন। যাতে অক্ষম বা সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিরাও রোজার তাৎপর্য থেকে বঞ্চিত না হয়। এ বিধান ৩টি ধাপে তুলে ধরা হলো-

> প্রথমত

যারা রোজা রাখতে অক্ষম তাদের মধ্য থেকে অসুস্থ ও সফরকারী লোকদেরকে এ শর্তে মুক্তি দেয়া হয়েছে যে, তারা রোগ এবং সফরের কারণে যে কয়দিন রোজা রাখতে অপারগ হবে পরে সে দিনগুলোতে রোজা রেখে রমজানের রোজা (২৯/৩০) পূর্ণ করে নিবে।

> দ্বিতীয়ত

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় যে বক্তি বেশি বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়ার কারণে অথবা সুস্থ্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; যাদের রোজা রাখা অত্যন্ত কষ্টকার বা একেবারেই অসম্ভব। তাদের জন্য (রমজানের প্রতিদিনি) একজন মিসকিনকে খাদ্যদান করা আবশ্যক।

তবে অনেক তাফসিরকারক বলেছেন, ‘ইসলামের প্রথম পর্যায়ে যারা রোজা রাখতে সামর্থ্য ছিল কিন্তু অভ্যাস না থাকার কারণে কষ্টকর ছিল; তারা যদি রোজা না রাখতে পারে তবে তাদের পরিবর্তে একজন মিসকিনকে ফিদিয়া তথা খাদ্যদান করার কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীতে সামর্থ্যবানদের জন্য ফিদিয়া দেয়ার বিধানকে রহিত করা হয়েছে।

আবার যারা সন্তানসম্ভবা নারী কিংবা শিশু বাচ্চাদের দুধদানকারী নারী, তাদের জন্য রোজা রাখা কষ্টকর হলে তারাও সন্তানের নিরাপত্তায় রোগীর বিধানের আওতায় পড়বে। যা পরে আদায় করে নিতে হবে।

> তৃতীয়ত

অসুস্থ রোগীদের যারা সামর্থবান, তারা যদি একজন মিসকিনের পরিবর্তে একাধিক মিসকিনকে খাদ্য দান করে, তবে তাদের জন্য এটা খুবই উত্তম।

আর যারা ঠিকভাবে রোজা পালন করবে না তাদের ব্যাপারেও প্রিয় নবি সতর্কতা ঘোষণা করেছেন-

হজরত কাব ইবনে উজরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এক দিন রাসুলুল্লাাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মসজিদে নববির) মিম্বরের প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলেন, তখন বললেন, ‘আমিন’। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন, তখন বললেন, ‘আমিন‘। যখন তিনি তৃতীয় সিঁড়িতে পা রাখলেন তখনও বললেন, ‘আমিন’।

হজরত কাব ইবনে উজরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন তিনি (মিম্বর থেকে) নামলেন, আমরা তাঁর কাছে আমিন বলার কারণ জানতে চাইলাম। বললাম এর আগে আপনাকে কখনো এভাবে আমিন বলতে শুনিনি।

উত্তরে তিনি বললেন, প্রথম সিঁড়িতে পা রাখার সময় জিবরিল আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসে বলরেন, ‘ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যে রমযান মাস পেল, তবুও তার গোনাহ মাফ করাতে পারল না। আমি বললাম, ‘আমিন’।

যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে পা রাখলাম তখন বললেন, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যার কাছে আপনার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করল না। আমি বললাম, ‘আমিন’।

যখন তৃতীয় সিড়িঁতে পা রাখলাম, তখন বললেন, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যে বৃদ্ধ পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তারা উভয় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না। অর্থাৎ তাদের খেদমতের মাধ্যমে নিজেকে জান্নাতবাসী করতে পারল না। আমি বললাম, আমিন।’ (মুসলিম, তিরজিমি)

রোজা বিধানের জন্য রমজান মাসকে বেচে নেয়ার কারণও আল্লাহ তুলে ধরেছেন এবং ১৮৪নং আয়াতের বিধানের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে আল্লাহ তাআলা বলেন-

شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ ۚ فَمَنۡ شَهِدَ مِنۡكُمُ الشَّهۡرَ فَلۡیَصُمۡهُ ؕ وَ مَنۡ كَانَ مَرِیۡضًا اَوۡ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ ؕ یُرِیۡدُ اللّٰهُ بِكُمُ الۡیُسۡرَ وَ لَا یُرِیۡدُ بِكُمُ الۡعُسۡرَ ۫ وَ لِتُكۡمِلُوا الۡعِدَّۃَ وَ لِتُكَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰی مَا هَدٰىكُمۡ وَ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُوۡنَ

‘রমজান সেই মাস; যে মাসে পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে। যে কুরআন মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক। আর তাতে রয়েছে সুস্পষ্ট হেদায়েত। যা হক ও বাতিলের পার্থকারী। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাস পবে তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। আর যে (এ মাসে) অসুস্থ কিংবা মুসাফির হবে সে অন্য সময় এ সংখ্যা (রমজানের রোজা) পূর্ণ করে নেবে। তোমাদের জন্য যা সহজ আল্লাহ তাই করেন। আর যা তোমাদের জন্য কঠিন তা তিনি করার ইচ্ছা করেন না। যেন তোমরা নির্ধারিত (রমজান মাসের) সময়টি সম্পূর্ণ করতে পার এবং আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর, কেননা আল্লাহ তোমাদের সঠিক পথ দেখিয়েছেন। যাতে তোমরা তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পার।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)

সুতরাং যারা কুরআন নাজিলের মাস রমজানকে হায়াতে জিন্দেগিতে পাবে তারা যেন এ মাসে রোজা পালন করে। এবং রমজান মাসব্যাপী রোজা পালন তাঁদের জন্য ফরজ। এ কারণেই প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের ২ মাস আগে থেকে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন।

রমজানে পানাহার ও নিজেদের স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যারা এ দু’টি কাজে লিপ্ত হবে তাদের রোজা হবে না। এ নিয়ে সাহাবায়ে কেরাম পেরেশানিতে পড়ে যান। আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে বিধান জারি করে সমাধান দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

اُحِلَّ لَكُمۡ لَیۡلَۃَ الصِّیَامِ الرَّفَثُ اِلٰی نِسَآئِكُمۡ ؕ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ؕ عَلِمَ اللّٰهُ اَنَّكُمۡ كُنۡتُمۡ تَخۡتَانُوۡنَ اَنۡفُسَكُمۡ فَتَابَ عَلَیۡكُمۡ وَ عَفَا عَنۡكُمۡ ۚ فَالۡـٰٔنَ بَاشِرُوۡهُنَّ وَ ابۡتَغُوۡا مَا كَتَبَ اللّٰهُ لَكُمۡ ۪ وَ كُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَكُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیۡطِ الۡاَسۡوَدِ مِنَ الۡفَجۡرِ۪ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ ۚ وَ لَا تُبَاشِرُوۡهُنَّ وَ اَنۡتُمۡ عٰكِفُوۡنَ ۙ فِی الۡمَسٰجِدِ ؕ تِلۡكَ حُدُوۡدُ اللّٰهِ فَلَا تَقۡرَبُوۡهَا ؕ كَذٰلِكَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ اٰیٰتِهٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ یَتَّقُوۡنَ

‘রোজার মাসে রাতের বেলায় তোমাদের স্ত্রীদের কাছে যৌন মিলনের জন্য যাওয়া তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। (কারণ তোমাদের) নারীরা যেমনি তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ, ঠিক তোমরাও তাদের জন্য পোশাক (সমতুল্য)। আল্লাহ তাআলা এটা জানেন, (রোজার মাসে রাতের বেলায় স্ত্রী সহবাসের ব্যাপারে) তোমরা (নানা ধরনের) আত্মপ্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছিলে, তাই তিনি (তোমাদের ওপর থেকে কড়াকড়ি শিথিল করে) তোমাদের ওপর দয়া করলেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিলেন। এখন তোমরা চাইলে তাদের সাথে সহবাস করতে পারো এবং (এ ব্যাপারে) আল্লাহ তোমাদের জন্য যা (বিধি বিধান কিংবা সন্তান সন্তুতি) লিখে রেখেছেন তা সন্ধান করো। (রোজার সময় পানাহারের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে,) তোমরা পানাহার অব্যাহত রাখতে পারো যতক্ষণ পর্যন্ত রাতের অন্ধকার রেখার ভেতর থেকে ভোরের শুভ্র আলোক রেখা তোমাদের জন্য পরিষ্কার না হয়। অতঃপর তোমরা রাতের আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করে নাও। (তবে) মসজিদে যখন তোমরা ইতেকাফ অবস্থায় থাকবে তখন নারী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকো। এ হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখা। অতএব তোমরা কখনো এর কাছেও যেয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর যাবতীয় নির্দশন মানুষের জন্য বলে দিয়েছেন। যাতে করে তারা (এ আলোকে) আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে পারে।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)

আয়াত ১৮৮-২০০

চাঁদের আবির্ভাব, ক্রমবৃদ্ধি ও ক্রমহ্রাসের বিবরণ, কুসংস্কারের মুলোৎপাটন, পবিত্র মাসসমূহে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধের বিবরণ, জিহাদে লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও বিধান প্রণয়ন, আল্লাহর পথে ব্যয়সহ হজ ও ওমরা বিধি-বিধান এবং হজের সমাপ্তি ও পরবর্তী করণীয় আলোচনা করা হয়েছে।

সর্বোপরি…

২০১নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য সর্বোত্তম দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। যে দোয়া মুসলিম উম্মাহ পবিত্র কাবা শরীফ তাওয়াফের সময় রুকনে ইয়ামেনি থেকে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত জায়গা অতিক্রমকালে তেলাওয়াত করে। এ দোয়া হলো বান্দার জন্য সর্বোত্তম দোয়া। আর তা হলো—

رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান্নার।’

অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, পরকালের কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে হেফাজত করুন।’

২০২নং আয়াতে বান্দার অর্জন সম্পর্কে আল্লাহর হিসাব গ্রহণের বিষয়ের গুরুত্ব ওঠে এসেছে।

আর এ দিনের তারাবিহর শেষ ২০৩নং আয়াতে হজের দিনগুলোতে মিনায় তিন দিন অবস্থানকালে আল্লাহর স্মরণ কেমন হবে তা তুলে ধরা হয়েছে। ওই সময়ের বিবরণ উল্লেখপূর্বক আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ আল্লাহর ভয়ই মানুষকে নাজাত দান করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَ اذۡكُرُوا اللّٰهَ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ تَعَجَّلَ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡهِ ۚ وَ مَنۡ تَاَخَّرَ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡهِ ۙ لِمَنِ اتَّقٰی ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّكُمۡ اِلَیۡهِ تُحۡشَرُوۡنَ

‘আর আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে। অতঃপর যে তাড়াহুড়া করে দুই দিনে চলে আসবে। তার কোনো পাপ নেই। আর যে বিলম্ব করবে, তারও কোনো অপরাধ নেই। (এ বিধান) তার জন্য, যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং জেনে রাখো, নিশ্চয়ই তোমাদের তাঁরই কাছে সমবেত করা হবে।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২০৩)

সুরা ফাতিহার হিদায়াতের দোয়া থেকে শুরু করে সুরা বাকারার ২০৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত আলোচনায় একটি কেন্দ্রীয় বার্তা প্রতিফলিত হয়—আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন। রোজা, নামাজ, কিবলা, হজ—সবকিছু মিলিয়ে একজন মুসলিমের পরিচয় গড়ে ওঠে আল্লাহভীরু, সচেতন ও দায়িত্বশীল বান্দা হিসেবে।

প্রথম তারাবিহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— রমজান কেবল সংযমের মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং আল্লাহর পথে অবিচল থাকার অঙ্গীকারের মাস। আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআনের আলোকে জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন।

 

 

আয়শা/১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬,/রাত ৮:২২

▎সর্বশেষ

ad