রোজায় কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীদের সতর্কতা ও করণীয়

admin | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২২ - ০৭:১৪:১০ পিএম

স্বাস্থ্য ডেস্ক : কোষ্ঠকাঠিন্য হলো একটি অস্বাভাবিক শারীরিক অবস্থা যখন একজন ব্যক্তি সহজে মলত্যাগ করতে সক্ষম হন না। সাধারণত এক বা দুই দিন পরপর মলত্যাগের বেগ হওয়া এবং শুষ্ক ও কঠিন মল নিষ্কাশন প্রক্রিয়াই চিকিৎসাশাস্ত্রে কোষ্ঠকাঠিন্য বলে পরিচিত।

রমজান মানেই পরিবর্তনের মাস। জীবনকে সুশৃঙ্খলিত একটি নিয়মে বেঁধে নিতে এসময় পরিবর্তন আনতে হয় খাবারের সময়ে, অভ্যাসে। তবে রোগীদের ক্ষেত্রে এসময় আরও বেশি পরিবর্তন আনতে হয়। রোজা রাখার পাশাপাশি নিজের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এ সময় তাদের প্রয়োজন হয় বাড়তি সতর্কতা।

রমজানে যেহেতু খাবারের সময়ে বেশ পরিবর্তন আসে, সেই সঙ্গে দীর্ঘ সময় পানি ও খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকোপ এই সময় বেড়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রমজানে রোজা রাখার পাশাপাশি আমরা যদি একটু বাড়তি যত্ন নেই তাহলে কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রকোপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারি।

যাদের আগেই কোষ্ঠকাঠিন্য আছে বা রোজায় যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তারা একটি সঠিক গাইডলাইন ফলো করলে এ সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি পেতে পারেন। এ বিষয়ে সময় টিভির একান্ত সাক্ষাৎকারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ

কোষ্ঠকাঠিন্যের মূল কারণ হলো শরীরে প্রয়োজনীয় পানির অভাব। তাই রোজার সময় এ সমস্যাটা আরও বেড়ে যায়। যা মলত্যাগের প্রক্রিয়ায় গুরুতরভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

রোজায় কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ

একজন রোজাদার যখন রোজা রাখেন স্বাভাবিকভাবেই তার পানি পান করার পরিমাণ কমে যায়। রোজায় কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেওয়ার এটিই মূল কারণ। এছাড়া দীর্ঘ সময় খাবার বিরতির পর ইফতারে ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত খাবার, চর্বি এবং মাংস জাতীয় খাবার বেশি খাওয়ার প্রবণতাও কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা বেড়ে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য বড় কারণ। খাবারে মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়াও এর একটি কারণের মধ্যে পড়ে।

এছাড়া রোজা রাখার পরে স্বাভাবিকভাবেই শরীর দুর্বল থাকে। দুর্বলতা থাকার কারণে ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি বা শারীরিক পরিশ্রম এসময় অনেকটাই কম হয়। এ কারণেও রোজার সময় কোষ্ঠকাঠিন্য বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাদের এমনিতেই কোষ্ঠকাঠিন্য থাকে তাদের এই সমস্যা আরও বেশি গভীর হয়ে ওঠে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য নাই রমজানে মূলত খাদ্যাভ্যাসের কারণেই তাদের কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

সতর্কতা

এমন পরিস্থিতিতে আমরা কি ধরনের সর্তকতা অবলম্বন করলে এই কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি সে বিষয়ে ডাঃ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন মনে করেন কিছু বিষয়কে এক্ষেত্রে অবশ্যই মেনে চলতে হবে। এগুলো হলো-

১. ইফতার কী দিয়ে করা হবে তার ওপর নজর দিন। সুস্বাস্থ্যের জন্য একটি খেজুর দিয়ে ইফতার ভাঙতে পারেন। এরপর এর পাশাপাশি ইফতারে রাখতে পারেন গ্রীষ্মকাল বা মৌসুমি ফলকে। কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে ইফতারে ফলের জুস হিসেবে রাখতে পারেন বেলের শরবত, তরমুজের শরবত, বিশেষ করে ইসবগুলের শরবত রাখুন।

২. এ সময় খাবারে রাখতে পারেন ফাইবার জাতীয় খাবার ও হেলদি ফুডকে। বাইরে তৈরি খাবারের পরিবর্তে ইফতারের প্রাধান্য দিন বাড়িতে তৈরি খাবারকে।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে কখনই ইফতারে বেশি খাবার খাওয়া যাবে না। ইফতারে বেশি খাবার খেয়ে অনেকেই রাতের খাবার বাদ দেন। তা মোটেও করা যাবে না। এর জন্য ইফতারে খেতে হবে এমন পরিমাণ খাবার যাতে রাতের খাবার সামান্য পরিমাণে হলেও খাওয়া যায়।

৪. রাতের খাবারের মাঝে মাঝে যে সময়টা ঐ সময়টাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার চেষ্টা করতে হবে।

৫. যাদের একটু হাঁটার অভ্যাস আছে তারা অবশ্যই খাবার গ্রহণের পরপরই কোনো ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটিতে যাবে না। কারণ সারাদিন অনাহারে থাকার পরে আমরা যখন খাবার গ্রহণ করি তখন ভরা পেটে হাঁটা বা ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি করলে তা শারীরিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৬. সেহরিতে কখনই ভরপেট খাওয়ার চেষ্টা করা যাবে না। এসময় সহজে হজম হয় এমন খাবারগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।

৭. সহজে হজম হয় এমন খাবারের মধ্যে রয়েছে আমরা রুটি, লাল চাল, শস্যজাতীয় খাবার ও রঙিন ফলমূল।

৮. মাংস বা যেকোনো খাবার অবশ্যই ভালো করে চিবিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কখনই সেহরি খেতে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। যাদের ৫ বা ১০ মিনিটে সেহরি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে তাদের এই অভ্যাস বন্ধ করতে হবে।

৯. দামি খাবার মানেই ভালো খাবার এমন ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দামি বা টেস্টি খাবারের চেয়ে হেলদি খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।

১০. কোষ্ঠকাঠিন্যের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনেক বেশি সময় টয়লেটে বসে থাকা। তাই এই অভ্যাসটি বাদ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টয়লেটে বেশি সময় না থাকা এবং নির্দিষ্ট সময়ে টয়লেটে যাওয়ার অভ্যাসে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে অনেকটাই দূরে থাকা যায়।

১১. অনেকেরই পাইলস বা এনাল ফিশারের সমস্যা থাকে। এই ধরনের সমস্যা যাদের থাকে তাদের রমজানে কোষ্ঠকাঠিন্য অনেকটাই বেড়ে যায়। এই সমস্যায় অনেক রোগীর মল শক্ত হয়ে যায়। কখনও কখনও রোগীর  ব্লিডিং বা ব্যথা হতে পারে। যাদের এই সমস্যা আছে তাদের আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

১২. এই সমস্যা সমাধানে তারা বাজারে বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন। এর ব্যবহারে মল অনেকটাই নরম থাকে ও রোগী আরাম বোধ করে। এভাবেই রোজার সময় কোষ্ঠকাঠিন্যকে সহজে নিয়ন্ত্রণে রেখে রোজা রাখা যাবে। সেই প্রতিকার করা যাবে কোষ্ঠকাঠিন্যের নানান উপসর্গকেও। নিজেকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে এইটুকু চেষ্টা আমাদের সকলেরই করা উচিত।

 

 

কিউটিভি/আয়শা/৭ই এপ্রিল, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ/সন্ধ্যা ৭:১৪

▎সর্বশেষ

ad