বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয়রা

superadmin | আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬ - ০৬:০০:৫৮ পিএম

ডেস্কনিউজঃ সম্প্রতি ভারত থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক মানুষ পুশইন চেষ্টার ঘটনা নওগাঁর সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমন অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন তারা।

নওগাঁ জেলার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। জেলার সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা, পোরশা উপজেলার নীতপুর এবং ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকিলাম, চকচণ্ডি, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দার সীমান্ত দিয়ে দুই দেশের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। এসব সীমান্তের মধ্যে হাঁপানিয়া, করমুডাঙ্গা ও নীতপুর বরাবরই স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সীমান্ত হত্যা, কৃষকদের হয়রানি এবং অনুপ্রবেশের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে এসব এলাকায়।

গত ৫ জুন নওগাঁর করমুডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান ও নজরদারির কারণে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি। প্রায় ১৯ ঘণ্টা সীমান্ত এলাকায় অবস্থানের পর বিএসএফ তাদের আবার ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

এই ঘটনার পর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে পুশইনের চেষ্টা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সাপাহার উপজেলার করমুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, চাষাবাদই আমাদের একমাত্র ভরসা। জমিতে কাজ করতে গেলেই অনেক সময় বিএসএফ সদস্যরা ধাওয়া দেয়, ভয়ভীতি দেখায়। কখনো কখনো সীমান্ত অতিক্রম করেও আসে। তারপরও জীবিকার তাগিদে আমাদের মাঠে যেতে হয়।

একই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানান, সীমান্তে আতঙ্কের ইতিহাস নতুন নয়। তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ বা ২০০০ সালের দিকে আমার চাচাসহ তিনজন নিজেদের জমিতে গম কাটছিলেন। তখন বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এখনও ঘাস কাটতে বা গরু চরাতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় মারধরও করা হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পুশইন আতঙ্ক বেশি দেখা যাচ্ছে। অবৈধভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিজিবি কঠোর অবস্থানে থাকলেও আমরা উদ্বেগের মধ্যে আছি।

পোরশা উপজেলার নীতপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রাসেদ বলেন, কয়েকদিন আগে রাতে খবর পাই বিএসএফ কিছু লোককে সীমান্তে এনে জড়ো করেছে। এরপর স্থানীয়রা লাঠি ও টর্চলাইট নিয়ে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয়। প্রায় দুই শতাধিক মানুষ রাতভর পাহারা দিয়েছে।

সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও গবাদিপশু পালন। অধিকাংশ পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস কৃষিজমি। কিন্তু সীমান্তঘেঁষা জমিতে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে।

মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, যেকোনো দেশে অবৈধ অভিবাসী থাকতে পারে। কিন্তু কাউকে আন্তর্জাতিক আইন ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্ত দিয়ে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। পুশইন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার পরিপন্থী এবং এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাসদের নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, সীমান্তে মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্তবাসী যেন নিরাপদে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, সে বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

এদিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন নওগাঁ-১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম।

তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।’

মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশইনের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিরোধে বিজিবি দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে বলে জানান তিনি।

বিপুল/০৯.০৬.২০২৬/বিকাল ৫.৫৭

▎সর্বশেষ

ad