মধ্যাঞ্চল ছাড়িয়ে দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা

superadmin | আপডেট: ২৯ জুন ২০২২ - ০১:২০:২৭ পিএম

ডেস্কনিউজঃ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা। সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বন্যার পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে সড়ক। এ অবস্থায় বানভাসি মানুষদের উদ্ধারে ও পুনর্বাসনে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। এরইমাঝে নতুন করে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এদিকে উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি নেমে তা মধ্যাঞ্চলের পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মঙ্গলবার (২৮ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, মৌসুমী বায়ুর অক্ষ বিহার, পশ্চিম বঙ্গ এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারী অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

বুধবার (২৯ জুন) সকালে ইত্তেফাকের সিলেট ব্যুরো প্রধান হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী জানান, সিলেটের কয়েকটি এলাকায় সুরমা-মেঘনা, যাদুকাটা, কুশিয়ারা, মনু, পিয়াইন ও সারিগোয়াইন নদীর পানির সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট পানি বিজ্ঞান উপ-বিভাগের বরাতে তিনি জানান, সিলেটের কানাইঘাট, সুনামগঞ্জের ছাতক ও দিরাই স্টেশনে সুরমা-মেঘনার পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে। সিলেটের অমলশিদ, শেওলা ও ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করেছে। অন্যান্য পয়েন্টেও বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে নদীর পানি। টানা বৃষ্টিপাতে সিলেট শহরে কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দিলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। তবে ভারী বর্ষণ হওয়ায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মানুষ আবারও বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা করছেন। রয়েছে পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা।

এর আগে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম মঙ্গলবার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় জানান, চেরাপুঞ্জিতে সবসময় বৃষ্টিপাত হয়। বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকবেই। গত ২৪ ঘণ্টায় উজানের ভারতের মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে ২০০ মিলিমিটার এবং সুনামগঞ্জের ছাতকে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানি ১৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। আবহাওয়ার ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে যাবার কোন বার্তা জানানো হয় নি। তবে নদী পানিতে টইটুম্বুর। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে লোকালয়ের নিচু এলাকাগুলোতে আবারও পানি আসতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, সিলেটের প্রায় দুই সপ্তাহের বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে, উত্তরাঞ্চল থেকে পানি নামার সাথে সাথে অন্যান্য এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে মধ্যাঞ্চল থেকে যখন পানি নামবে তখন দক্ষিণাঞ্চল প্লাবিত হবে। তবে সিলেট বিভাগের জেলাগুলোতে মঙ্গলবার (২৮ জুন) রাতে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর আগে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী স্থানে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে যে কারণে মঙ্গলবার সকাল থেকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নদীতে পানির উচ্চতা বেড়েছে। আগেই বলেছি জুন মাসের ২৬ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত নিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হওয়া কিছুটা কমে যাবে। এছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, কুচবিহার ও আসাম রাজ্যে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির পানির পুরোটাই তিস্তা ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে ২৯ জুনের পর থেকে। ফলে ৩০ জুন থেকে আবারও তিস্তা ও যমুনা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের জেলাগুলো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, ও কুচবিহার জেলা ও আসাম রাজ্যে ১০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে— যা লাল চিহ্নিত অংশে বাংলাদেশের তিস্তা নদী ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের মাধ্যমে যমুনা নদীতে প্রবেশ করবে। সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ ও মেঘালয় পর্বত এলাকায়ও ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা কমলা চিহ্নিত।

বুধবার (২৯ জুন) বেলা ১১টায় তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টার কিছু পর থেকে শুরু হয়ে আজ সকাল প্রায় ৮টা পর্যন্ত মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হয়েছে সিলেট ও রংপুর বিভাগের জেলাগুলোতে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় অনেক ভারি বৃষ্টি হয়েছে আজ মধ্য রাতের পর থেকে। সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ভারী বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে যে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে সকাল থেকে তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃষ্টিপাত ফেনী, কুমিল্লা ও উত্তর চট্রগ্রাম জেলায়ও হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে। ধারণা করা যাচ্ছে আজ দিন শেষে কিংবা আগামীকালের মধ্যে তিস্তা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এর কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আরও বলেন, ভূ-উপগ্রহের ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে— গত ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের জেলাগুলো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, ও কুচবিহার জেলা ও আসাম রাজ্যে ১০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টিপাতের পুরো অংশ বাংলাদেশের তিস্তা নদী ও বক্ষমপুত্র নদের মাধ্যমে যমুনা নদীতে প্রবেশ করবে। সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ ও মেঘালয় পর্বত এলাকায়ও ২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে যা সিলেট ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় জমা হবে। গত সপ্তাহের বন্যার পানি ইতোমধ্যেই দেশের মধ্যাঞ্চলে পৌঁছে গেছে। শরিয়তপুর জেলার পদ্মা ও বরিশাল জেলার কীর্তনখোলা নদীতে বন্যা সতর্কতার সীমার মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে গত ৩ দিন থেকে যে বৃষ্টি হচ্ছে তার কারণে দেশের বিশাল একটি অংশে বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে।

তিনি আরও জানান, আবহাওয়া পূর্বাভাসের বিভিন্ন মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, জুলাই মাসের ৪ তারিখ পর্যন্ত চলমান বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ চলমান বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়াটা প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। জুলাই মাসের ৩ তারিখের পর থেকে দেশের মধ্যাঞ্চল ও ৭ তারিখের পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর বন্যা পরিস্থিতির অবনতির প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জুলাই মাসে ফের বন্যার আশঙ্কা করেছিলাম, পরিস্থিতি সেদিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি রাখার পাশাপাশি শুকনো খাবার সংগ্রহ ও বিভিন্ন সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগ্রহণ করলে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো যাবে।

এদিকে প্লাবন ভূমি, নদীর অববাহিকা ও হাওর অঞ্চল দখল হওয়ায় বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে বলে এক গবেষণা প্রতিবেদন করেছেন দেশ-বিদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক। গত দুই দশকে নাসার ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতে রাতের আলোর উজ্জ্বলতা বিশ্লেষণ করে তারা নগরায়ণ ও কলকারখানার সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি চিহ্নিত করেন। গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা বলছেন, নদনদীর দুই কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৯২ শতাংশ বনভূমি, ৬ শতাংশ তৃণভূমি ও ২৮ শতাংশ অনুর্বর ভূমি কমেছে। এ ছাড়া নদনদীর অববাহিকা, প্লাবন ভূমি ও হাওর অঞ্চলের ১২ শতাংশ এলাকায় নগরায়ণ ও কলকারখানা গড়ে উঠেছে। দেশে নদী অববাহিকায় জনসংখ্যা বেড়েছে, যারা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ড. আশরাফ দেওয়ান, ডার্ক বুতজে ও গ্রিগরি কিসেলেভ; যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ড. আরিফ মাশরুর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহবুব মোর্শেদ এই গবেষণায় অংশ নেন। তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, যশোর ও খুলনা শহরের রাতের আলোর উজ্জ্বলতা বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ঢাকা ও চট্টগ্রামের পর রাতের উজ্জ্বলতা সবচেয়ে বেড়েছে সিলেটে। গত দুই দশকে প্রায় ৬৫ শতাংশ আলোর উজ্জ্বলতা বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে গবেষক ড. মাহবুব মোর্শেদ বলেন, প্রাকৃতিভাবেই সিলেট বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চল। এর মধ্যে সিলেটের অধিকাংশ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন উপশহর গড়ে উঠেছে হাওর দখল করে। এতে বন্যা বা বৃষ্টির পানি নেমে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বন্যার পানি প্লাবন ভূমি, হাওর ও নদী অববাহিকায় অবস্থান করে। অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো তৈরির ফলে পানিপ্রবাহে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে বন্যা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বিপুল/২৯.০৬.২০২২/ দুপুর ১.১৫

▎সর্বশেষ

ad