১৫শ’ কোটি টাকার বাজার

ডেস্ক নিউজ : জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি, দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিও, হে অনুরাগী! কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের এই আবেদন বৃথা যায়নি। ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য এবং বিশুদ্ধতা সবাইকে আজ বিমোহিত করছে। আজকাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সংবর্ধনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ফুল। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, পূজা পার্বণ, সভা-সেমিনার কিংবা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কোনোটারই পূর্ণতা পায় না ফুলের ব্যবহার ছাড়া। কোনো কোনো অনুষ্ঠানের মূল উপজীব্যই হচ্ছে ফুলেল শুভেচ্ছা।

বিশেষত মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখ, ভ্যালেনটাইনস ডে, পহেলা ফাল্গ–নে ফুলের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে পড়েছে। এছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, জাতীয় নেতাদের মৃত্যু বার্ষিকীতেও তাদের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর প্রচলন বেড়েছে। এভাবে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও দিনদিন ফুলের চাহিদা ও ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ছোট্ট পরিসরে শখের বসে করা বাগানে আর এই ফুলের চাষ সীমাবদ্ধ থাকছে না। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশে এখন বাণিজ্যিকভিত্তিতেও ফুলের উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে।

জাতীয় কৃষি বাতায়নের তথ্যমতে, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে ৫০ জাতের ফুলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ হেক্টর। এটা মোট ফুল আবাদি জমির ৭৪ ভাগ। ২য় স্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ ৬৯০ হেক্টর বা মোট আবাদের ২০ ভাগ।এছাড়া ৩য় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ ১২১ হেক্টর বা ৩ দশমিক ৪৪ ভাগ। এছাড়া রংপুর বিভাগে ৪২ হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ হয়। যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কৃষক। এদের মধ্যে খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ২৫০ জন (৭৫ শতাংশ), ঢাকা বিভাগে ৩ হাজার জন (২০ শতাংশ)। বাকি ৫ শতাংশ কৃষক রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে ফুল চাষে নিয়োজিত।

তাছাড়া ফুল উৎপাদন ও বিপণন ব্যবসায় প্রায় দুই লাখ মানুষ জড়িত। আর এ খাতের কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন আরও প্রায় ৭ লাখ মানুষ। উৎপাদিত ফুল দেশের চাহিদার বেশিরভাগ পূরণ করছে। কিছু ফুল বিদেশে রফতানিও হচ্ছে।যার মাধ্যমে আসছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। এসব বাস্তবতার কারণে ফুল আবাদে আগ্রহী হচ্ছে বড় বড় খামারিরাও। সম্প্রতি ‘ফুলের চাষাবাদ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অন্যতম ব্যবসায়িক সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নব্বইয়ের দশকের আগে দেশে ফুলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হতো।

আর এখন দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার ৯০ শতাংশ মেটানো যাচ্ছে। বর্তমানে সার্বিকভাবে ফুলের বাজার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিছু ফুল আমদানি হলেও এখন দেশ থেকে ফুল রফতানিও হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গ্লাডিওলাস মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, দুবাই, কাতার ও আবুধাবিতে যায়। প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় হাজারখানেক স্থায়ী ও অস্থায়ী ফুলের দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকানে প্রতিদিনের গড় বিক্রি ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। যা উৎসবকেন্দ্রিক কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশে ২০০৮ সালে ফুল রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩৭৬ কোটি টাকা। বর্তমানে বছরে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার ফুল রফতানি হয়। এর মধ্যে তাজা, শুকনো ও কৃত্রিম ফুল রয়েছে। দেশের বাজার ও রফতানির বাজার ধরে এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। একে কেন্দ্র করে গ্রামে বাড়ছে টাকার প্রবাহ। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্যমতে, ফুল উৎপাদন ও বাণিজ্যিক চাষাবাদের সঙ্গে জড়িত ১৪৫টি দেশ। বর্তমানে বিশ্বে বার্ষিক ফুলের চাহিদার পারিমাণ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে ফুলের বাজার প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে সারা দেশে ফুলের চাহিদা থাকলেও তার বেশিরভাগই রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে রাজধানী এখন এই ফুলের প্রধান বাজারে পরিণত হয়েছে। এক সময় রাজধানীর হাইকোর্ট মাজারের সামনে ফুলের বিপণিবিতানগুলো ছিল।আর এখন তা শাহবাগ, কাঁটাবন, খামারবাড়ী, ধানমণ্ডি, বনানী, লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। শাহবাগে শিশুপার্কসংলগ্ন এলাকায় বসে অন্যতম পাইকারি বাজার। ঢাকা ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির তথ্যানুযায়ী, সারা ঢাকায় ফুটপাতসহ অভিজাত ফুল বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা এখন প্রায় এক হাজার। আর সারা দেশে এই সংখ্যা চার হাজারের ওপরে।

স্বাভাবিক সময়ে যে কেনাবেচা হয়, তাতে কখনও কখনও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত লাভ হয়। তবে বিশেষ দিনে এই হার অনেক ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ডিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এর সঙ্গে জড়িত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের স্বল্পহারে ঋণসুবিধা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তি প্রাপ্তি ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ প্রদান, উন্নত ও নতুন নতুন জাতের বীজ সরবরাহ করা, ওয়্যারহাউস ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ এবং সর্বোপরি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন।

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাওয়ার এক্সিবিশন অ্যান্ড কনফারেন্স সংক্রান্ত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম ‘ল্যান্ড অব ফ্লাওয়ার’ বলে বাংলাদেশকে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত ফুল বিদেশে রফতানির জন্য প্যাকেজিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, হিমাগার স্থাপন, ফুলের নতুন নতুন জাত উৎপাদনের প্রয়োজন রয়েছে। এ খাতের উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো স্থাপন এবং গবেষণা পরিচালনায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার কথাও জানান তিনি। তবে ফুল শিল্পের এসব সুযোগ ও সম্ভাবনার মধ্যেও রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ।

এ প্রসঙ্গে কৃষিবিদ মাহমুদ হোসেন বলেন, ফুল উৎপাদন প্রযুক্তির ওপর অনেক কৃষকের জ্ঞানের অভাব, অতিরিক্ত মূলধন ব্যয়, বীজ ও চারার অপ্রাপ্যতা এবং এ ব্যাপারে ভারত থেকে আমদানিনির্ভরতা, গ্রিনহাউস নির্মাণের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অপ্রাপ্যতা, ফুল চাষের জন্য বিশেষ কম্পাউন্ড সারের অভাব, ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে স্থায়ী পাইকারি ফুলের বাজারের অভাব, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন প্রযুক্তির অভাব, কৃষক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে ২০ শতাংশ ফুল বিনষ্ট হওয়া এবং ফুল নিয়ে প্রয়োজনীয় গবেষণার অভাব ও একটি জাতীয় ফুল নীতি না থাকাকে এ খাতের সীমাবদ্ধতা হিসেবে মনে করছেন।

 

 

কিউটিভি/আয়শা/১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ইং /সন্ধ্যা ৬:৫১

শেয়ার করুন